7/Slider/slider-tag <center><div id='bp_recent'></div><div class='bp_footer'><small><a id='bp_recent_link' target='_blank' href='http://www.bloggerplugins.org/2011/09/recent-posts-thumbnails-blogger-widget.html?utm_src=bp_recent' style='padding: 1px 0px 0px 19px;text-decoration:none;'><a href='http://www.bloggerplugins.org/?utm_src=bp_recent' target='_blank' title='blogger widgets'></a></a></small></div> <script style='text/javascript' src='http://bloggergadgets.googlecode.com/files/recentposts_orig.js'></script> <script style='text/javascript'> var numberOfPosts = 5; var showPostDate = false; var showSummary = false; var titleLength = 0; var showCommentCount = false; var showThumbs = true; var showNoImage = true; var imgDim = 125; var imgFloat = 'left'; var myMargin = 5; var mediaThumbsOnly = true; var showReadMore = false; </script> <script src='https://hindudarshon.blogspot.com/feeds/posts/default?max-results=5&orderby=published&alt=json-in-script&callback=bprecentpostswiththumbnails'> </script></center>

পৃষ্ঠাসমূহ

২৬ ডিসেম্বর, ২০২১

মহাভারতের কাহিনী

মহাভারতের কাহিনী

    সংক্ষিপ্তরূপে মহাভারতের কাহিনী শুরু করছি। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ মহাভারত রচনা করেন। মহাভারতে ধর্ম, রাজনীতি, রণকৌশল, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, গার্হস্থ্যধর্ম, রাজধর্ম প্রভৃতি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এজন্য কথিত আছে “যা নেই মহাভারতে তা নেই ভারতে”। মহাভারতে মূলত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধই প্রাধান্য পেয়েছে। অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশীর দিন, ভরণী নক্ষত্রে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে আঠার দিন পর অমাবস্যা তিথিতে শেষ হয়েছিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় যুধিষ্ঠিরের বয়স ছিল ৭২ বছর, ভীমের ৭১ বছর, অজুনের ৭০ বছর এবং নকুল ও সহদেবের ৬৯ বছর। মহাভারতের চারটি স্তম্ভ, যথা ধর্শ, অর্থ, কাম ও মোক্ষ। মহাভারতের আঠারটি পর্বে মোট এক লক্ষ শ্লোক রয়েছে। ১৮টি পর্বের নাম আদি, সভা, বন, বিরাট, উদ্যোগ, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, শল্য, সৌপ্তিক, স্ত্রী, শান্তি, অনুশাসন, অশ্বামেধিক, আশ্রমবাসিক, মৌষল, মহাপ্রস্থানিক ও স্বর্গারোহন পর্ব। সম্পূর্ণ মহাভারত রচনা করতে মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ ব্যাসদেবের তিন বৎসর সময় লেগেছিল। গণেশ মহাভারতের লিপিকার। নিচে মহাভারতের সংক্ষিপ্ত কাহিনী বর্ণনা করা হল।

মহাভারত

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-১

    চন্দ্রপুত্র বুধের ঔরসে মনুর কন্যা ইলার গর্ভে পুরূরবা নামক এক পুত্রের জন্ম হয়। পুরূরবার পুত্রের নাম আয়ু এবং আয়ুর পুত্রের নাম নহুষ। নহুষপুত্র যযাতি দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানী এবং দৈত্যরাজ বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠাকে বিয়ে করেন। যযাতির ঔরসে এবং শর্মিষ্ঠার গর্ভে দ্রুহ্যু, অনু ও পুরু নামের তিনটি পুত্রের আর দেবযানীর গর্ভে তুর্বসু ও যদু নামের দুইটি পুত্রের জন্ম হয়। এই যদু হতেই যদু বংশের এবং কনিষ্ঠ পুত্র পুরু হতে পুরু বংশের উৎপত্তি হয়েছে। পুরুবংশের রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে বিয়ে করেন এবং শকুন্তলার গর্ভে জন্ম নেন মহারাজ ভরত। বর্তমান ভারতবর্ষের নামটি এসেছে রাজা ভরতের নাম অনুসারে। ভরতের বংশে হস্তী নামের এক রাজা ছিলেন। তিনি নিজের নামানুসারে হস্তিনাপুর নামক এক নগর স্থাপন করেন। হস্তীর তিন পুরুষ পরে রাজা হন সম্বরণ। সম্বরণের ঔরসে এবং সূর্যকন্যা তপতীর গর্ভে জন্ম নেন রাজা কুরু। রাজা কুরু যে স্থানে তপস্যা করেছিলেন সে স্থানের নাম হয় পবিত্র কুরুক্ষেত্র। যেহেতু কুরুক্ষেত্র ছিল তপস্যার স্থান সেহেতু কুরুক্ষেত্রকে ধর্মক্ষেত্রও বলা হয়।

    মহারাজ কুরুর ছয় পুরুষ পরে জন্য নেন প্রতীপ। রাজা প্রতীপের শান্তনু নামক এক পুত্র হয়। একদিন রাজা শান্তনু গঙ্গাতীরে এক পরমা সুন্দরী কন্যাকে দেখে মুগ্ধ হলেন এবং তাঁকে বিয়ে করতে চাইলেন। কন্যাটিও শান্তনুকে বিয়ে করতে রাজি হলেন কিন্তু একটি শর্তে, তাঁর কোন কাজে বাঁধা দেয়া হলে তিনি তাঁকে ছেড়ে চলে যাবেন। শান্তনু তাঁর শর্ত মেনে নিয়ে সংসার করতে শুরু করলেন। তারপর রাজা শান্তনুর সাতটি পুত্রের জন্ম হল। কিন্তু ঐ সাতটি পুত্রকেই তাঁর স্ত্রী এক এক করে জলে ফেলে দিলেন আর তিনিও শর্তের কথা ভেবে বাধা দিতে পারলেন না। অষ্টম পুত্র জলে ফেলে দেয়ার সময় শান্তনু বাধা দিলে শর্তানুযায়ী তাঁর স্ত্রী সবকিছু ছেড়ে অষ্টম পুত্রকে নিয়ে চলে যান। আসলে যিনি শান্তনুর স্ত্রী হয়েছিলেন, তিনিই দেবী গঙ্গা আর ঐ অষ্টম সন্তান হলেন অষ্টবসু। ব্রহ্মার শাপে গঙ্গাকে মর্তে্য শান্তনুর স্ত্রী হতে হয়েছিল এবং বশিষ্ঠ মুনির শাপে অষ্টবসুগণকে মর্তে্য এসে মনুষ্য রূপে জন্ম নিতে হয়েছিল। শান্তনুর অষ্টম পুত্র ছিলেন দ্যু নামক বসু। গঙ্গা একদিন তাঁর অষ্টম পুত্রকে লালন-পালন করের এবং বশিষ্টের নিকট হতে বেদ অধ্যয়ন করতে পাঠান। তারপর একদিন গঙ্গা ঐ পুত্রকে শান্তনুর কাছে রেখে চলে গেলেন। এই অষ্টম পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল দেবব্রত যিনি পরে ভীষ্ম নামে খ্যাত হয়েছিলেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-২

    শান্তনু একদিন যমুনা তীরবর্তী বনে বেড়াতে গিয়ে মৎস্যগন্ধা নামক এক রূপবতী নারীর সন্ধান পান। ধীবরের (জেলের) কন্যা মৎস্যগন্ধা খেয়া পারাপার করতেন অর্থাৎ তিনি পাটনী ছিলেন। মৎস্যগন্ধা সত্যবতী নামেও পরিচিতা ছিলেন। শান্তনু সত্যবতীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁর পিতা দাসরাজের কাছে গেলেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। সত্যবতীর গর্ভজাত সন্তানকেই রাজা করতে হবে এই একটি শর্তে দাসরাজ মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু শান্তনু তাঁর পুত্র ভীষ্মের কথা ভেবে ঐ শর্তে রাজি না হয়ে মনঃকষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। পিতাকে চিন্তিত দেখে ভীষ্ম রাজমন্ত্রীকে পিতার চিন্তার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। রাজমন্ত্রী তাঁকে সব ঘটনা খুলে বললেন। তারপর ভীস্ম দাসরাজের কাছে গিয়ে পিতার জন্য সত্যবতীকে প্রার্থনা করলেন এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, সত্যবতীর গর্ভের সন্তানই রাজা হবে। কিন্তু তাতেও দাসরাজ সন্তুষ্ট নন এই ভেবে যে, যদি ভীষ্মের পুত্র রাজা হতে চান তবে সত্যবতীর পুত্র রাজা হতে পারবে না। তখন ভীষ্ম প্রতীজ্ঞা করলেন যে, তিনি কখনও বিবাহ করবেন না। ভীষ্মের এই প্রতীজ্ঞা শুনে দেবগণ ও পিতৃগণ পুষ্প-বৃষ্টি করতে লাগলেন। রাজা শান্তুনু ভীষ্মের পিতৃভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ইচ্ছামৃত্যুর বর দিলেন। তারপর সত্যবতীর সাথে রাজা শান্তনুর বিয়ে হল।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-৩

    সত্যবতীর গর্ভে চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য নামের দুই পুত্রের জন্ম হয়। পুত্রদের শৈশবকালেই রাজা শান্তনু গত হন। গন্ধর্বরাজের সাথে যুদ্ধে চিত্রাঙ্গদ প্রাণ হারালে বিচিত্রবীর্য সিংহাসনে বসেন। ভীষ্ম ভ্রাতা বিচিত্রবীর্যের বিয়ের জন্য কাশীরাজের তিন কন্যা অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকাকে নিয়ে আসলেন। জ্যেষ্ঠ কন্যা অম্বা জানালেন যে, তিনি শাল্বরাজকে ভালবাসেন। তাই ভীষ্ম অম্বাকে ছেড়ে দিলেন এবং অপর দুই বোনের সাথে বিচিত্রবীর্যের বিয়ে দিলেন। সাত বৎসর পর কোন সন্তান হওয়ার আগেই বিচিত্রবীর্য মারা যান। তাই বংশরক্ষার জন্য সত্যবতী ভীষ্মকে ঐ দুই বিধবা ভ্রাতৃবধুকে বিয়ে করতে বললেন। কিন্তু ভীষ্ম তাঁর প্রতীজ্ঞা লঙ্ঘন করতে অসম্মত হলেন। অগত্যা সত্যবতী বংশরক্ষার জন্য তাঁর পুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়নকে ডাকলেন। সত্যবতী যখন কুমারী ছিলেন তখন পরাশরের ঔরসে তাঁর গর্ভে কৃষ্ণদ্বৈপায়নের জন্ম হয়েছিল। দ্বীপে জন্ম এবং গায়ের বর্ণ কালো বলেষ্ণ তিনি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন নামে পরিচিত হলেন। পরে তিনি বেদকে চার খণ্ডে বিভক্ত করে ব্যাসদেব নামে খ্যাত হলেন। যা হোক, সত্যবতীর অনুরোধে পুত্র উৎপাদনের জন্য অম্বিকা ও অম্বালিকা কৃষ্ণদ্বৈপায়নের নিকট গেলেন। অম্বিকা কৃষ্ণদ্বৈপায়নের গৃহে গিয়ে ভয়ে চোখ বুজে ছিলেন বলে তাঁর গর্ভের সন্তান জন্মান্ধ হল আবার অম্বালিকা কৃষ্ণ-দ্বৈপায়নকে দেখে পাণ্ডু বর্ণ ধারণ করেছিলেন বলে তাঁর গর্ভের পুত্রের পাণ্ডু বর্ণ ধারণ করল। অম্বিকার পুত্রের নাম রাখা হল ধৃতরাষ্ট্র আর অম্বালিকার পুত্রের নাম রাখা হল পাণ্ডু। অম্বিকা ঋতুবতী হলে সত্যবতী তাঁকে পুনরায় ব্যাসের কাছে যেতে বললেন কিন্তু অম্বিকা নিজে না গিয়ে পাঠালেন এক দাসীকে। ঐ দাসীর গর্ভে জন্ম নিলেন বিদুর। যিনি পরম ধার্মিক হিসেবে জগতে খ্যাত হয়েছিলেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-৪

    ধৃতরাষ্ট্র জেষ্ঠ পুত্র হলেও জন্মান্ধ বলে রাজা হলেন পাণ্ডু। ভীষ্ম গান্ধাররাজ সুবলের কন্যা গান্ধারীর সথে ধৃতরাষ্ট্রের বিয়ে দিলেন। তারপর ভীষ্ম শূরের কন্যা কুন্তীর সাথে পাণ্ডুর বিয়ে দিলেন। এবার একটু কুন্তীর ইতিহাস বর্ণনা করা যাক। পূর্বে কুন্তীর নাম ছিল পৃথা। শূর তাঁর কন্যা পৃথাকে দান করেন পিসতুত ভাই কুন্তিভোজকে। কুন্তিভোজ নিঃসন্তান ছিলেন বলে পরম যত্নে পৃথাকে লালন-পালন করেছিলেন। কুন্তিভোজের ঘরে পালিত হয়েছেন বলে পৃথার নাম কুন্তী নামে পরিচিতা হলেন। একদিন দর্বাসা মুনি কুন্তীর অতিথিসেবায় তুষ্ট হয়ে বর দিলেন যে, কুন্তী যে দেবতাকে আহবান করবেন, সে দেবতা তাঁকে দর্শন দেবেন এবং ঐ দেবতার কৃপায় তিান পুত্র লাভ করবেন। কুন্তী কুমারী অবস্থায় কৌতুহলবশত সূর্যকে আহবান করেছিলেন। তখন সূর্য এসে দেখা দিলেন এবং পুত্র লাভের বর দিলেন। তারপর কুন্তীর একটি পুত্র জন্ম নিল। পুত্রটি কবচ ও কুণ্ডল নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। কলঙ্কের ভয়ে কুন্তী তাঁর পুত্রকে পাত্রে রেখে জলে ভাসিয়ে দিলেন। সূত-বংশীয় অধিরথ এবং তাঁর পত্নী রাধা সেই শিশুকে পেয়ে লালন-পালন করতে থাকেন এবং তাঁর নাম রাখেন বসুষেণ। এই বসুষেণ পরে কর্ণ নামে খ্যাত হন। কর্ণ খুবই দানশীল ছিলেন। একদিন ইন্দ্র ব্রাহ্মণ বেশে এসে তাঁর কাছে কবচ (বর্ম) ও কুণ্ডল চাইলেন। কর্ণ সে কবচ দেহ থেকে কেঁটে বের করে এনে ইন্দ্রকে দান করলেন। ইন্দ্র তুষ্ট হয়ে তাঁকে একটি শক্তি অস্ত্র দিলেন। অস্ত্রটির বৈশিষ্ট্য এমন এটি যাকে উদ্দেশ্য করে নিক্ষেপ করা হবে তিনি অবশ্যই মরবেন এবং মরার পর ঐ অস্ত্র আবার তার কাছে ফিরে আসবে। যা হোক, কুন্তীর স্বয়ংবর-সভায় কুন্তী পাণ্ডুর গলেই বরমাল্য দিলেন। তারপর পাণ্ডু কুন্তীকে বিয়ে করে হস্তিনাপুর নিয়ে এলেন। কিছুদিন পর ভীষ্ম মদ্ররাজ শল্যের বোন মাদ্রীর সাথে পাণ্ডুর দ্বিতীয় বিবাহ দিলেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-৫

    ব্যাসদেব গান্ধারীকে বর দিয়েছিলেন তিনি শতপুত্রের জননী হবেন। কিন্তু গান্ধারী গর্ভবতী হওয়ার পর দুবছর পর্যন্ত কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়নি। গান্ধারী এ জ্বালা সহ্য করতে না পেরে নিজেই গর্ভপাত ঘটালেন। ফলে তিনি একটা লোহার মত মাংস-পিণ্ড প্রসব করলেন। ব্যাসের উপদেশে মাংস-পিণ্ড জলে ভিজিয়ে রাখলে তাতে একশত ভ্রুণ উৎপন্ন হল। ঐ একশত ভ্রুণকে একশত ঘৃতপূর্ণ কলসে রাখা হল। এক বৎসর পর দুর্যোধনাদি শতপুত্র এবং এক কন্যা দুঃশলার জন্ম হল। দুর্যোধনের জন্মের পূর্বেই কুন্তীর গর্ভে যুধিষ্ঠিরের জন্ম হল। কুন্তী ও মাদ্রীর গর্ভে পাঁচ পুত্র জন্মেরও এক ইতিহাস আছে। একদিন পাণ্ডু বনে মৃগয়ায় গিয়ে এক হরিণযুগলকে মৈথুনরত অবস্থায় শরবিদ্ধ করেছিলেন। কিমিন্দম মুনিই হরিণের রূপ ধারণ করে পুত্র লাভের আশায় মৈথুন করছিলেন। কিমিন্দম মুনি ব্রাহ্মণ হত্যার অপরাধে পাণ্ডুকে শাপ দিলেন যে, তিনিও ভার্যাগমনকালে মৃত্যুবরণ করবেন। পাণ্ডু শাপগ্রস্ত হয়ে খুব চিন্তিত হলেন এবং নিজেকে সংযম করে মুনি-ঋষির মত অরণ্যবাসী হতে চাইলেন। কিন্তু পত্নীদের অনুরোধে তাঁদেরকেও সাথে নিলেন। তারপর পাণ্ডু একদিন কুন্তীর নিকট বংশরক্ষা বিষয়ে আলোচনা করলেন। পাণ্ডু চাইলেন তাঁদের যেভাবে জন্ম হয়েছিল, কুন্তী ও মাদ্রীর গর্ভেও সেভাবে পুত্র উৎপন্ন করতে। তখন কুন্তী তাঁকে দুর্বাসার দেয়া বরের কথা বললেন। তারপর পাণ্ডুর সম্মতিতে কুন্তী ধর্মকে আহবান করলেন, ফলে ধর্মের ঔরসে জন্ম নিলেন যুধিষ্ঠির। তারপর কুন্তী বায়ু ও ইন্দ্রকে আহবান করায় তাঁদের ঔরসে ভীম ও অর্জুনের জন্ম হল। এরপর কুন্তী মাদ্রীর গর্ভেও সন্তান উৎপাদন করতে চাইলেন এবং মাদ্রীকে কোন এক দেবতাকে আহবান করতে বললেন। মাদ্রী তখন অশ্বিদ্বয়কে আহবান করায় তাঁদের বরে নকুল ও সহদেব নামে জমজ পুত্রদ্বয় লাভ করলেন। তারপর একদিন মাদ্রীকে দেখে পাণ্ডু সংযম হারলেন এবং ঐ মুনির বাক্য অনুযায়ী মৃত্যুবরণ করলেন। মাদ্রী সেই শোকে তাঁর দুই পুত্রকে কুন্তীর হাতে তুলে দিয়ে সহমরণে চলে গেলেন। আশ্রমে কিছুদিন কাটানোর পর ঋষিদের সহায়তায় কুন্তি পাঁচপুত্র সহ হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন। তখন যুধিষ্ঠিরের বয়স ষোল, ভীমের পনের, অজুর্নের চৌদ্দ এবং নকুল-সহদেবের তের বৎসর।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-৬

    হস্তিনাপুরে পণ্ডুর পুত্ররা পাণ্ডব এবং ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা কৌরব নামে পরিচিত ছিলেন। পাণ্ডব ও কৌরবদের অস্ত্রশিক্ষার হাতেখড়ি ঘটে কৃপাচায্যের্র নিকট। পরে ভীষ্ম দ্রোণের অস্ত্র-প্রতীভায় মুগ্ধ হয়ে দ্রোণকেই পাণ্ডব ও কৌরবদের অস্ত্রগুরু হিসেবে নিযুক্ত করলেন। দ্রোণ কিন্তু ব্রাহ্মণের সন্তান। তাঁর পিতা হলেন গঙ্গোত্তরী প্রদেশের ভরদ্বাজ ঋষি। তাঁর জন্ম হয়েছিল দ্রোণের (কলস) মধ্যে সে জন্য তিনি দ্রোণ নামেই খ্যাত হলেন। দ্রোণ অগ্নিবেশ্য মুনির কাছে আগ্নেয়াস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। তিনি পরশুরামের নিকটও অনেক অস্ত্র লাভ করেন। অস্ত্রবিদ্যায় রাজকুমারদের মধ্যে সব থেকে পারদর্শী ছিলেন অজুর্ন। তাই দ্রোণ সব শিষ্য থেকে অজুর্নকে বেশি ভালবাসতেন।

    ভীষ্ম, বিদুর ও ধৃতরাষ্ট্রের সম্মতিতে দ্রোণাচার্য একদিন রাজকুমারগণের অস্ত্রকৌশল প্রদর্শনের ব্যবস্থা করলেন। একে একে সব রাজকুমারগণ অস্ত্র-কৌশল প্রদর্শন করলেন। অস্ত্র-কৌশল প্রদর্শন অনুষ্ঠানে কর্ণও উপস্থিত ছিলেন। অজুর্ন যে সব অস্ত্র-কৌশল প্রদর্শন করলেন, দ্রোণের অনুমতি নিয়ে কর্ণও তা করে দেখালেন। তারপর কর্ণ অজুর্নের সাথে যুদ্ধ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। অজুর্নও কর্ণকে যুদ্ধের আমন্ত্রন জানালেন। দ্রোণের অনুমতিতে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হল। দুর্যোধন ও তার ভ্রাতাগণ কর্ণের পক্ষে যোগ দিল। ভীষ্ম, বিদুর, কৃপাচার্য ও দ্রোণাচার্য রইলেন অজুর্নের পক্ষে। কুন্তী কর্ণকে চিনতে পেরে মূর্ছিত হলেন। ফলে সকলের নিকট পরিচয় অজ্ঞাতই থেকে গেল। রাজাগণ নীচ জাতি এবং রাজা ভিন্ন অন্য কারো সাথে যুদ্ধ করেন না। তাই কৃপাচার্য কর্ণের পরিচয় জানতে চাইলেন। তখন দুর্যোধন বললেন, “অজুর্ন যদি রাজা ভিন্ন অন্য করো সাথে যুদ্ধ করতে না চান তবে কর্ণকে আমি অঙ্গরাজ্যে অভিষিক্ত করছি”। দুর্যোধন কর্ণর্কে রাজা করায় যুদ্ধে আর বাধা থাকল না। কিন্তু হঠাৎ করে কর্ণের পালক পিতা সূতবংশীয় অধিরথ সেখানে উপস্থিত হলে কর্ণর্ তাকে প্রণাম করে আলিঙ্গন করলেন। তখন সবাই জেনে গেল যে, কর্ণ সূতপুত্র। ভীম কর্ণর্কে সূতপুত্র বলে তিরস্কার করলেন। নীচ জাতির সাথে কোন রাজার যুদ্ধ হতে পারে না, তাই শেষ পর্যন্ত অজুর্ন ও কর্ণের্র যুদ্ধ হল না। তবে সকলেই জেনে গেল যে, কর্ণের্র তুল্য ধনুর্ধর পৃথিবীতে বিরল।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-৭

    পাণ্ডবরা ছিলেন খুবই ধর্মপরায়ণ অথচ কৌরবরা ছিলেন ঠিক তাঁদের বিপরীত। কৌরবরা কখনই পাণ্ডবদের ভাল চাইত না। দুর্যোধন একবার গঙ্গাতীরে প্রমাণকোটি নামক স্থানে ছল করে ভীমকে বিষ খাইয়ে অচেতন করে জলে ফেলে দিলেন। ভীম তখন জলে নিমগ্ন হয়ে নাগলোকে চলে গেলেন। পরে নাগরাজ বাসুকির সহায়তার সুস্থ হয়ে অযুত হস্তীর বল লাভ করে ফিরে এলেন। কিছুদিন পর ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে যুবরাজ হিসেবে অভিষিক্ত করলেন। এতে দুর্যোধনাদি কৌরবগণ ঈর্ষান্বিত হলেন। পাণ্ডবদের বিনাশের জন্য দুর্যোধন তার মাতুল সুবলপুত্র শকুনি ও কর্ণের সাথে ষড়যন্ত্র করতে লাগলেন। দুর্যোধন ও তার মাতুল শকুনির মন্ত্রণায় ধৃতরাষ্ট্র পঞ্চ-পাণ্ডব ও কুন্তীকে পশুপতি উৎসব দেখার নাম করে বারণাবত নামক নগরে পাঠান। সেখানে তাঁদের বসবাসের জন্য দুযোর্ধন পুরোচন নামক এক মন্ত্রীর সহায়তায় জতুগৃহ (গালা দ্বারা তৈরী গৃহ) নির্মাণ করে রাখেন। দুর্যোধনের অভিপ্রায় ছিল পুরোচনের সাহায্যে ঐ জতুগৃহে আগুন দিয়ে পাণ্ডবদের মেরে ফেলা। কিন্তু পাণ্ডবরা বিদুরের অনুচরের মাধ্যমে জানতে পারলেন যে, কৃষ্ণ-চতুর্দশীর রাতে পুরোচন জতুগৃহে আগুন দেবেন। তাই তাঁরা বিদুরের ঐ অনুচরের সহায়তায় গৃহের মধ্যে সুরঙ্গ তৈরী করে রাখেন। পাণ্ডবগণ কৃষ্ণ-চতুর্দশী আসার আগেই জতুগৃহে আগুন দিয়ে সুরঙ্গপথে গঙ্গা পেরিয়ে গহীন অরণ্যে পলিয়ে গেলেন। দুর্যোধনাদি অন্য ছয় জনের দগ্ধ মৃতদেহ দেখে ভাবলেন পাণ্ডবগণ ও কুন্তী মারা গেছেন। মূলত ঐ ছয় জন ব্যক্তি ছিলেন এক নিষাদ-স্ত্রী ও তার পাঁচ পুত্র যারা ঐ দিন ঐ গৃহে এসেছিলেন ভোজন করতে। খবর শুনে হস্তিনাপুরে শোকের ছায়া নেমে এল। কেবল বিদুরই প্রকৃত ঘটনা জানতেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-৮

    পাণ্ডবরা যে বনে ঘুমাচ্ছিলেন তার কিছু দূরেই একটি শালগাছে হিড়িম্ব ও হিড়িম্বা নামে দুই রাক্ষস-রাক্ষসী বাস করত। তারা ছিল ভাই-বোন। পাণ্ডবদের দেখে হিড়িম্ব তার বোন হিড়িম্বাকে পাঠাল তাঁদের ধরে নিয়ে আসতে। কিন্তু হিড়িম্বা সুপুরুষ ভীমকে দেখে তাঁর প্রেমে পড়ে যায় এবং পাণ্ডবদের বধ করার কথা ভুলে যায়। হিড়িম্বা সুন্দরী রমণীর বেশ ধরে ভীমের কাছে যায় এবং পাণ্ডবদের বাঁচানোর জন্য হিড়িম্বের দুরভিসন্ধির কথা বলে দেয়। হিড়িম্বার মুখে সব কথা শুনে ভীম হিড়িম্বের নিকট যান এবং হিড়িম্বকে একাই বধ করেন। হিড়িম্বা কুন্তীর নিকট ভীমকে পতি হিসেবে প্রার্থনা করলে কুন্তীও সম্মত হন। তারপর ভীমের ঔরসে হিড়িম্বার গর্ভে এক পুত্রের জন্ম হয়। তার মাথা ঘটের মত এবং চুল খাড়া বলে তার নাম দেয়া হয় ঘটোৎকচ। যখন তাকে ডাকা হবে, তখনই সে হাজির হবে একথা বলে ঘটোৎকচ চলে গেল।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-৯

    পাণ্ডবরা বল্কল ও মৃগচর্ম পরিধান করে তপস্বীর বেশে মৎস্য, ত্রিগর্ত, পাঞ্চাল ও কীচক দেশের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় পিতামহ ব্যাসের সাথে দেখা হয়ে গেল। তখন ব্যাস তাঁদের একচক্রা নগরে এক ব্রাহ্মণের গৃহে রেখে আসলেন। সেই নগরে একবার বক-রাক্ষসের দৌরাত্ম্যে লোকজন অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। মাতার আদেশে ভীম বক-রাক্ষসকে বধ করেন। পরে তাঁরা পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় যোগদানের জন্য পাঞ্চালদেশে যাত্রা শুরু করেন। একদিন পর তাঁরা গঙ্গাতীরে সোমাশ্রয়ণ তীর্থে যান। সেখানে গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ সস্ত্রীক ভ্রমণে এসে পাণ্ডবদের দেখে হিংসিত ও কুপিত হলেন। চিত্ররথ তাঁদের আক্রমন করলে অজুর্ন তা প্রতিহত করেন এবং গন্ধর্বরাজের রথ দগ্ধ করে ফেলেন। অজুর্ন যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে গন্ধর্বরাজের প্রাণভিক্ষা দেওয়ায় গন্ধর্বরাজ তাঁদের বন্ধু হয়ে গেলেন। গন্ধর্বরাজ পাণ্ডবদের চাক্ষুষী-বিদ্যা ও আগ্নেয়াস্ত্র দান করে প্রস্থান করেন। পরে পাণ্ডবরা ব্রাহ্মণের বেশে দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় যোগদান করেন।

    দ্রৌপদী কিন্তু রাজা দ্রুপদের ঔরসজাত কন্যা নয়। একবার রাজা দ্রুপদ দ্রোণের নিকট পরাজিত হয়েছিলেন। তিনি প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ও পুত্র কামনায় যাজ ও উপযাজ নামক দুই ব্রাহ্মণের শরণাপন্ন হন। তাঁদের নির্দেশমত তিনি পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করলে যজ্ঞের অগ্নি থেকে অগ্নিবর্ণের, বর্ম-মুকুটভূষিত, খড়গ-ধনুর্বাণধারী এক কুমার এবং শ্যামবর্ণের এক পরমা সুন্দরী কুমারী উঠে আসলেন। ঐ অগ্নিবর্ণের কুমার ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং শ্যামবর্ণের কুমারী কৃষ্ণা নামে খ্যাত হলেন। দ্রুপদের কন্যা বলে কৃষ্ণা দ্রৌপদী নামে পরিচিতা হলেন। দ্রুপ দ্রুৌপদীকে অজুর্নের সাথে বিবাহ দিতে চাইলেন। তাই তিনি এমন এক ধনু নির্মাণ করালেন যাতে গুণ পড়ানো দুঃসাধ্য। তিনি শূন্যে স্থাপিত একটি যন্ত্রের উপর একটি লক্ষ্যবস্তু রাখলেন এবং শর্ত দিলেন যে, যিনি এই ধনুতে গুণ লাগিয়ে লক্ষ্যবস্তু ভেদ করতে পারবেন তিনিই হবেন তাঁর কন্যার বর। রাজা দ্রুপদ দ্রৌপদীকে বিবাহ করার কঠিন শর্ত দিলেন কারণ তিনি জানতেন যে, ঐ লক্ষ্যভেদ একমাত্র অজুর্ন ছাড়া আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়।

    দ্রৌপদীর সয়ংসভার দিন সভায় উপস্থিত রাজারা একে একে লক্ষ্যভেদ করার চেষ্টা করলেন কিন্তু কেউই লক্ষ্যভেদ তো দূরের কথা, ধনুতে গুণই লাগাতে পারলেন না। কর্ণ সেই ধনুতে গুণ লাগিয়ে লক্ষ্যভেদ করতে যাবেন এমন সময় দ্রৌপদী উচ্চস্বরে বললেন, আমি সূতজাতীয়কে বরণ করব না। কর্ণ অগত্যা লজ্জিত হয়ে ধনু পরিত্যাগ করলেন। তাঁরপর ব্রাহ্মণবেশী অজুর্ন সেই ধনুতে গুণ লাগিয়ে লক্ষ্যভেদ করলেন এবং দ্রৌপদীর বরমাল্য গ্রহণ করলেন। তারপর পাণ্ডবরা দ্রৌপদীকে নিয়ে তাঁদের আশ্রয়দাতা কুম্ভকারের গৃহে এসে আনন্দিত মনে কুন্তীকে জানালেন যে, তাঁরা ভিক্ষা এনেছেন। কুন্তী না দেখেই গৃহের ভেতর থেকে বলে বসলেন, “তোমরা সকলে মিলে ভোগ কর”। পরে দ্রৌপদীকে দেখে কুন্তীর ভুল ভাঙল। কিন্তু মাতৃআজ্ঞা পালনের জন্য পঞ্চ-ভ্রাতাই দ্রৌপদীকে পত্নী রূপে গ্রহণ করলেন। এ কার্যে অজুর্নেরও সম্মতি ছিল। পূর্বজন্মের কৃতকর্মের ফলে দ্রৌপদীর পঞ্চ-স্বামী লাভ করেছেন। পূর্বজন্মে দ্রৌপদী ছিলেন মুনিকন্যা। তিনি তপস্যা করে মহাদেবকে তুষ্ট করলেন এবং বর চাইলেন যে, তিনি যেন সর্বগুণান্বিত পতি লাভ করেন। তিনি পাঁচবার এই বর চাওয়ায় মহাদেব তাঁকে বললেন, “পরজন্মে ভরতবংশীয় পাঁচপুুত্র তোমার পতি হবেন”। পূর্বজন্মের এই বরেই তিনি পঞ্চস্বামী লাভ করলেন। কিন্তু রাজা দ্রুপদ তা মেনে নিতে চাইলেন না। তাই ব্যাস তাঁকে বোঝালেন যে, এই পঞ্চ-পাণ্ডব মূলত ধর্ম, বায়ু, ইন্দ্র ও অশ্বীদ্বয়ের ঔরাসজাত পুত্র। মহাদেবের ইচ্ছায় ঐ পঞ্চ-দেবতা মনুষ্যগর্ভে পুত্র উৎপাদন করেছেন। সেই সাথে তিনি পূর্বজন্মে মহাদেবের বরে দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামী লাভ করার কথাও বললেন। সব শুনে রাজা দ্রুপদ পাণ্ডবদের প্রস্তাবে রাজি হলেন এবং পঞ্চ-পাণ্ডবের সাথে পৃথকভাবে দ্রৌপদীর বিয়ে দিলেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-১০

    দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় কর্ণ ও দুর্যোধন ছিলেন। তাই তাদের মাধ্যমে ধৃতরাষ্ট্র সহ কুরুকুলের সকলেই জেনে গেল যে, পাণ্ডবরা বেঁচে আছেন। তারপর ভীষ্ম, দ্রোণ ও বিদুরের পরামর্শে ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবগণ, কুন্তী ও দ্রৌপদীকে হস্তিনাপুর নিয়ে আসলেন। ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “তোমরা অর্ধরাজ্য নাও এবং খাণ্ডবপ্রস্থে বাস কর, তাহলে আমাদের মধ্যে আর বিবাদ হবে না”। পাণ্ডবগণ তাতে সম্মত হয়ে কৃষ্ণকে সাথে নিয়ে খাণ্ডবপ্রস্থে গেলেন। সেখানে তাঁরা একটি নগর স্থাপন করলেন যা ইন্দ্রপস্থ নামে পরিচিতি পেল। ইন্দ্রপস্থে পাণ্ডবগণ সুখে-শান্তিতে বাস করতে লাগলেন।

    পাণ্ডবগণ নিয়ম করলেন যে, দ্রৌপদী এক জনের ঘরে এক বৎসর বাস করবেন এবং ঐ সময়ে অন্য কোন ভাই ঐ ঘরে ঢুকলে তাঁকে ব্রহ্মচারী হয়ে বার বৎসর বনবাসে যেতে হবে। দ্রৌপদী যখন যুধিষ্ঠিরের ঘরে ছিলেন তখন অজুর্ন ব্রাহ্মণদের গোধন রক্ষার জন্য অস্ত্র আনতে যুধিষ্ঠিরের গৃহে গিয়েছিলেন। ফলে নিয়ম লঙ্ঘন হওয়ায় অজুর্ন স্বেচ্ছায় ব্রহ্মচারীর বেশে বনবাসে চলে গেলেন। অজুর্ন ব্রহ্মচারীর বেশে বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করতে লাগলেন। তিনি ঘটনাক্রমে নাগরাজকন্যা উলূপীর সাথে মিলিত হন এবং তাঁর নিকট হতে বিদায় নিয়ে মণিপুর রাজ্যের চিত্রবাহনের কন্যা চিত্রাঙ্গদাকে বিবাহ করেন। চিত্রাঙ্গদার গর্ভে বভ্রুবাহন নামক এক পুত্রের জন্ম হয়। পরে তিনি কুমীররূপা অপ্সরা বর্গা ও তাঁর চার সখীকে শাপমুক্ত করেন। তারপর অজুর্ন কৃষ্ণের সঙ্গে দ্বারকায় যান। কৃষ্ণের ইচ্ছায় তিনি সুভদ্রাকে হরণ করে বিয়ে করেন এবং বার বৎসর পুর্ণ করে সুভদ্রাকে নিয়ে ইন্দ্রপ্রন্থে ফিরে আসেন। সুভদ্রার গর্ভে এক পুত্রের জন্ম হল। পুত্রটি মন্যুমান (তেজস্বী) বলে তাঁর নাম রাখা হল অভিমন্যু। অভিমন্যু ছাড়াও দ্রৌপদীর গর্ভে প্রতিবিন্ধ্য, সুতসোম, শ্রুতকর্মা, শতনীক ও শ্রুতসেন নামের পাঁচটি পুত্রের জন্ম হল।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-১১

    শ্বেতকি রাজার যজ্ঞের ঘৃত পান করে অগ্নিদেবের ক্ষুধামন্দা হয়েছিল। তিনি ক্ষুধামন্দা দূর করার জন্য ব্রহ্মার পরামর্শে খাণ্ডব বন দহন করতে চাইলেন। কিন্তু ইন্দ্র বর্ষণের মাধ্যমে খাণ্ডব-দহন কার্যে বাধা সৃষ্টি করলেন। তখন অগ্নিদেব কৃষ্ণ ও অজুর্নের শরণাপন্ন হলেন। তারপর অগ্নি বরুণকে স্মরণ করলে বরুণ এসে অজুর্নকে চন্দ্রপ্রদত্ত গাণ্ডীব ধনু, দুই অক্ষয় তূণী ও কপিধ্বজ রথ দিলেন এবং কৃষ্ণকে একটি চক্র ও কৌমোদকী গদা দিলেন। কৃষ্ণ ও অজুর্ন ঐ সব অস্ত্রের সাহায্যে ইন্দ্রকে পরাজিত করে অগ্নিকে খাণ্ডব-দহনে সাহায্য করলেন। খাণ্ডব-দহনে কেবল তক্ষকপুত্র অশ্বসেন, নমুচির ভ্রাতা ময় দানব এবং চারটি শাঙ্গর্ক পক্ষী জীবিত ছিল। অজুর্নের জন্য মহাশিল্পী ময়দানবের প্রাণ রক্ষা পেল। তাই কৃতজ্ঞতাসরূপ তিনি যুধিষ্ঠিরের জন্য এক সভাগৃহ নির্মাণ করে দিলেন।

   ইন্দ্রপ্রস্থে যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞ করার কথা চিন্তা করলেন। রাজাসূয় যজ্ঞ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য কৃষ্ণ ও ভীম মিলে জরাসন্ধকে বধ করলেন। যজ্ঞের নিয়ম অনুযায়ী পাণ্ডবরা বিভিন্ন রাজ্য জয় করে ধন-সম্পদ নিয়ে আসলেন। রাজসূয় যজ্ঞে কৌরবরা ছাড়াও বিভিন্ন রাজ্য হতে রাজা-মহারাজারা উপস্থিত হলেন। যজ্ঞ চলাকালে শ্রীকৃষ্ণ শিশুপালের উদ্ধত আচরণে ক্রদ্ধ হন এবং সুদর্শন চক্র দিয়ে তাঁকে বধ করেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-১২

    রাজসূয় যজ্ঞে পাণ্ডবদের ঐশ্বর্য দেখে দুর্যোধন ও শকুনি হিংসিত হলেন। শকুনি ছিলেন দ্যূতক্রীড়ায় (পাশা খেলা) পারদর্শী। শকুনি চাইলেন দ্যূতক্রীড়ার মাধ্যমে পাণ্ডবদের সর্বশান্ত করতে। এজন্য সে ধৃতরাষ্টকে কুমন্ত্রণা দিতে লাগল। ধৃতরাষ্ট্র শকুনির মন্ত্রণায় বিদুরের নিষেধ অমান্য করে যুধিষ্ঠিরকে পাশা খেলায় আমন্ত্রণ জানান। যুধিষ্ঠির শকুনির সাথে পাশা খেলাতে চাননি কিন্তু পিতৃব্য ধৃতরাষ্ট্রের আমন্ত্রন উপেক্ষা করতে পারেননি। পাশা খেলায় বিভিন্ন ধনসম্পত্তি পণ রাখতে হত। পাশা খেলায় সুচতুর শকুনির নিকট যুধিষ্ঠির পরাজিত হয়ে সব ধন-সম্পত্তি হারালেন। শেষে শকুনির কথায় যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে পণ রাখলেন। কিন্তু তখনও যুধিষ্ঠির হেরে যান, ফলে দ্রৌপদীকে দ্যূতসভায় ডেকে এনে দুর্যোধনাদি কৌরবরা অপমান করতে থাকলেন এবং দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্র ধরে টানতে লাগলেন। দ্রৌপদী লজ্জা নিবারণের জন্য কৃষ্ণকে স্বরণ করতে লাগলেন। তখন স্বয়ং ধর্ম বস্ত্রের রূপ ধরে তাঁকে আবৃত করলেন, ফলে দুঃশাসন বারংবার বস্ত্র আকর্ষণ করলেও তাঁর শরীরের বস্ত্র ফুরালো না। সভায় তখন সবাই দ্রৌপদীর প্রশংসা এবং দুঃশাসনের নিন্দা করতে লাগলেন। ভীম দুঃশাসনের এই পাপাচারে কুপিত হয়ে শপথ করলেন যে, তিনি দুঃশাসনের বক্ষ বিদীর্ণ করে রক্ত পান করবেন। পরে ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরের প্রতি সদয় হয়ে ধন সমেত ফিরে যেতে বললেন এবং পাণ্ডবগণ ইন্দ্রপস্থে ফিরে গেলেন।

    দ্যূতক্রিড়ায় ধনসম্পদ হস্তগত না করতে পেরে দুর্যোধন দুঃশাসন, কর্ণ আর শকুনি পুনরায় দ্যূতক্রিড়ার আয়োজন করার জন্য ধৃতরাষ্ট্রকে রাজি করান। এরকম পরাজিত পক্ষকে মৃগচর্ম পরিধান করে বার বৎসর বনবাস এবং এক বৎসর অজ্ঞাতবাস করতে হবে এই ছিল এবারের দ্যূতক্রীড়ার পণ। ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীর নিষেধ অমান্য করে পাণ্ডবদের দ্যূতক্রিড়ায় আমন্ত্রন জানানোর জন্য দূত পাঠান। এবারও যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রের আমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে পারলেন না এবং ঐ শর্ত মেনে দ্যূতক্রিড়া শুরু করেন। কিন্তু কুচক্রী শকুনির নিকট তিনি আবার পরাজিত হলেন এবং শর্তানুযায়ী তাঁর চার ভ্রাতা ও দ্রৌপদীকে সাথে নিয়ে বার বৎসর বনবাসের উদ্দেশ্যে উত্তরমুখে যাত্রা করলেন। 

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-১৩

পাণ্ডবগণ অরণ্যে মৃগচর্ম পরিধান করে ফলমূল আহার করে বাস করতে লাগলেন। কিছুদিন পরে যুধিষ্ঠিরের পরামর্শে অজুর্ন দিব্যাস্ত্র লাভের জন্য হিমালয় ও গন্ধমাদন পার হয়ে ইন্দ্রকীল পর্বতে গেলেন। সেখানে ইন্দ্রের সাথে দেখা হয়ে গেল। অজুর্ন ইন্দ্রের কাছে দিব্যাস্ত্র চাইলে ইন্দ্র বললেন, “মহাদেবকে সন্তুষ্ট করতে পারলে দিব্যাস্ত্র দেব”। তারপর অজুর্ন মহাদেবের কঠোর তপস্যায় রত হলে মহাদেব কিরাত বেশে অজুের্নর নিকট আসলেন এবং বৃষধ্বজ ও ব্রহ্মশির নামের পাশুপত অস্ত প্রদান করে চলে গেলেন। তখন বরুণ, কুবের, যম ও ইন্দ্র আসলেন। যম দণ্ড, বরুণ পাশ এবং কুবের অন্তর্ধান নামক অস্ত্র অজুর্নকে দিলেন। পরে ইন্দ্র অজুর্নকে দিব্যাস্ত্র দেওয়ার জন্য স্বর্গে নিয়ে গেলেন। অজুর্ন স্বর্গে পাঁচ বৎসর ধরে ইন্দ্রের নিকট বিভিন্ন অস্ত্রলাভ করলেন। স্বর্গের উর্বশী অজুর্নের সাথে মিলিত হতে চাইলে অজুর্ন তাঁকে ফিরিয়ে দেন, তাই উর্বশী অজুর্নকে শাপ দিলেন যে, তাঁকে নপুংসক নর্তক হয়ে স্ত্রীদের মধ্যে বিচরণ করতে হবে। পরে অজুর্ন চিত্রসেন নামক গন্ধর্বের সাথে স্বর্গবাস করতে লাগলেন।

    অজুর্নের বিরহে পাণ্ডবগণ কাম্যক বন ছেড়ে তীর্থযাত্রা করলেন। তাঁরা নৈমিষারণ্য, প্রয়াগ, অগস্ত্যের আশ্রম, মণিমতী পুরী প্রভৃতি স্থান ভ্রমণ করতে লাগলেন। জটাসুর নামক এক রাক্ষস ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে পাণ্ডবদের সাথে থাকতেন। একদিন সে সুযোগ বুঝে তাঁদের সব অস্ত্র হরণ করে নিয়ে চলে গিয়েছিল। পরে ভীম একাই বাহুযুদ্ধে জাটাসুরকে বধ করে সব অস্ত্র উদ্ধার করলেন। বনবাসের পাঁচ বৎসর পূর্ণ হলে অজুর্ন স্বর্গ থেকে ফিরে এসে সবার সাথে মিলিত হলেন। তাঁরপর গন্ধমাদন পর্বতে কুবেরের উদ্যানে পাণ্ডবগণ চার বৎসর বাস করার পর বৃষপর্বা ও বদরিকা আশ্রম হয়ে কিরাতরাজ সুবাহুর দেশে গেলেন। সেখান থেকে তাঁরা যমুনার উৎপত্তি-স্থলের নিকট বিশাখযূপ বনে এসে এক বৎসরকাল মৃগয়া করে কাটাতে লাগলেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-১৪

    একদিন ভীমসেন বিশাখযূপ বনে মৃগয়ায় গেলে এক অজগর তাঁকে বেষ্টন করে ধরল। ভীম শত চেষ্টায়ও অজগরের বন্ধন খুলতে না পেরে দুর্বল হয়ে পড়লেন। যুধিষ্ঠির ভীমকে খুজতে এসে দেখেন এক অজগর ভীমকে বেষ্টন করে আছে। যুধিষ্ঠিরকে দেখে অজগর প্রশ্ন করলেন, ব্রাহ্মণ কে? এবং জ্ঞাতব্য কি? তখন যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন সত্য, দান, ক্ষমা, সুচরিত্র, অহিংসা, তপস্যা ও দয়া যাঁর আছে, তিনিই ব্রাহ্মণ এবং সুখ-দুঃখহীন পরব্রহ্মই জ্ঞাতব্য। অজগর যুধিষ্ঠিরের উত্তরে সন্তুষ্ট হন এবং বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বিষয়ে আলোচনা করে ভীমকে ছেড়ে দিন। এই অজগর হলেন তাঁদের পূর্বপুরুষ নহুষ, যিনি অগস্ত্যের শাপে অজগর হয়েছিলেন। যুধিষ্ঠিরের স্পর্শে অজগররূপী নহুষ শাপমুক্ত হয়ে স্বর্গে চলে গেলেন। বিশাখযূপ বনে এক বৎসর কাটানোর পর পাণ্ডবরা আবার কাম্যক বনে ফিরে আসলেন। কিছুদিন পর সেখানে তাঁদের দেখতে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পত্নী সত্যভামা সহ উপস্থিত হয়েছিলেন। মার্কণ্ডেয় মুনি এসেও তাঁদের নানা ধর্মীয় উপাখ্যান শুনিয়েছিলেন। মার্কণ্ডেয় চলে গেলে পাণ্ডবরা দ্বৈতবনে গিয়ে বাস করতে লাগলেন। পাণ্ডবরা দ্বৈতবনে আছে জেনে দুর্যোধন, কর্ণ, শকুনি প্রভৃতি কৌরবরা দ্বৈতবনে আসলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল পাণ্ডবদের দুরবস্থা দেখে উপহাস করা কিন্তু তাদের সে আশা পূর্ণ হল না। সেখানে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন কৌরবদের আক্রমন করলেন এবং তাঁদের পরাজিত করলেন। তখন কৌরব সৈন্যরা পান্ডবদের শরণাগত হলে পাণ্ডবরা চিত্রসেনকে পরাজিত করে দুর্যোধনদের মুক্ত করলেন, ফলে তাঁরা লজ্জিত হয়ে হস্তিনাপুর ফিরে গেলেন।

    দ্রৌপদী একটি সূর্যদত্ত থালা পেয়েছিলেন। তিনি যতক্ষণ পর্যন্ত না খেতেন ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ থালার অন্ন ফুরাত না। কাম্যক বনে থাকাকালে একদিন দুর্বাসা মুনি তাঁর দশ হাজার শিষ্য নিয়ে পাণ্ডবদের অতিথি হয়েছিলেন কিন্তু তখন পাণ্ডব ও দ্রৌপদীর ভোজন শেষ হয়ে গিয়েছিল। দুর্বসারা স্নান করতে যাওয়ার পর দ্রৌপদী কৃষ্ণকে স্তব করলে কৃষ্ণ উপস্থিত হলেন। কৃষ্ণের কৃপায় দুর্বসাদের মনে হল যেন তাঁরা আকণ্ঠ ভোজন করেছেন। তখন তাঁরা ভোজন করতে না এসে প্রস্থান করলেন এবং কৃষ্ণও পাণ্ডবদের থেকে বিদায় নিলেন। একদিন দুঃশলার পতি সৌবীররাজ জয়দ্রথ কাম্যক বনে এসে দ্রৌপদীকে দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে একা পেয়ে হরণ করেন। পাণ্ডবগণ মৃগয়া থেকে ফিরে দ্রৌপদীর ধাত্রীকন্যার মুখে শোনেন যে, দ্রৌপদীকে জয়দ্রথ হরণ করেছেন। তখন পাণ্ডবগণ জয়দ্রথকে খুজে বের করে পরাজিত করেন এবং দ্রৌপদীকে মুক্ত করেন। যুধিষ্ঠিরের দয়ায় জয়দ্রথ প্রাণ নিয়ে ফিরে গেল।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-১৫

    পাণ্ডবদের বনবাসের দ্বাদশ বর্ষের সময় এক ব্রাহ্মণের অরণি উদ্ধার করতে পাণ্ডবরা একটি হরিণের পিছনে ছুটলেন কিন্তু হরিণকে ধরতে পারলেন না। পাণ্ডবগণ ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়ে সরবরের নিকট গেলেন জলপানের উদ্দেশ্যে। তখন আকাশবাণী হল “বৎস, এই জলে আমার অধিকার আছে, আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও তারপর পান কর”। যুধিষ্ঠির ব্যতীত সবাই সে আকাশবাণী উপেক্ষা করে জল পান করে মারা গেলেন। যুধিষ্ঠির এসে দেখেন সরবরের তীরে চার ভাইয়ের মৃত দেহ পড়ে আছে। তখন এক বকরূপী যক্ষ এসে বললেন, “আমিই তোমাদের ভ্রাতাগণকে মেরেছি। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিলে তোমারও মৃত্যু হবে”। যুধিষ্ঠির সব প্রশ্নের উত্তর দিতে সম্মত হলেন। যক্ষের প্রথম প্রশ্ন ছিল, “কে সূর্যকে ঊর্ধে রেখেছে? কে সূর্যের চতুর্দিকে ভ্রমণ করে? কে তাঁকে অস্তে পাঠায়? কোথায় তিনি প্রতিষ্ঠিত আছেন?” তখন যুধিষ্ঠির উত্তর করলেন, “ব্রহ্ম সূর্যকে ঊর্ধে রেখেছেন, দেবগণ তাঁর চতুর্দিকে বিচরণ করেন, ধর্ম তাঁকে অস্তে পাঠান, সত্যে তিনি প্রতিষ্ঠিত আছেন”। তারপর যক্ষ প্রশ্ন করলেন, “ব্রাহ্মণের দেবত্ব কি কারণে হয়? কোন ধর্মের জন্য তাঁরা সাধু? তাঁদের মনুষ্যভাব কেন হয়? অসাধুভাব কেন হয়?” যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, “বেদাধ্যয়নের ফলে দেবত্ব, তপস্যার ফলে সাধুতা, তাঁরা মরেন এজন্য তাঁরা মানুষ এবং পরনিন্দার ফলে তাঁরা অসাধু হন”। তারপর যক্ষ বললেন, “ক্ষত্রিয়দের দেবত্ব কি? সাধুধর্ম কি? মনুষ্যভাব কি? অসাধুভাব কি?” যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, অস্ত্রনিপুণতাই ক্ষত্রিয়ের দেবত্ব, যজ্ঞই সাধুধর্ম, ভয়ই মনুষ্যভাব, শরণাগতকে পরিত্যাগই অসাধুভাব”। যক্ষ বললেন, “পৃথিবী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কে? আকাশ অপেক্ষা উচ্চতর কে? বায়ু অপেক্ষা গতিশীল কে? তৃণ অপেক্ষা বহুতর কে?” যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, “মাতা পৃথিবী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, পিতা আকাশ অপেক্ষা উচ্চতর, মন বায়ু অপেক্ষা গতিশীল, চিন্তা তৃণ অপেক্ষা বহুতর”। তারপর যক্ষ প্রশ্ন করলেন, “সুপ্ত হয়েও কে চক্ষু মুদ্রিত করে না? জন্মগ্রহণ করেও কে স্পন্দিত হয় না? কার হৃদয় নেই? বেগ দ্বারা কে বৃদ্ধি পায়?” যুধিষ্ঠির বললেন, “মৎস্য নিদ্রাকালেও চক্ষু মুদ্রিত করে না, ডিম প্রসূত হয়েও স্পন্দিত হয় না, পাষাণের হৃদয় নেই, নদী বেগ দ্বারা বৃদ্ধি পায়”। তখন যক্ষ প্রশ্ন করলেন, “প্রবাসী, গৃহবাসী, আতুর ও মুমূর্ষুর মিত্র কারা?” যুধিষ্ঠিরের উত্তর দিলেন, “প্রবাসীর মিত্র সঙ্গী, গৃহবাসীর মিত্র ভার্যা, আতুরের মিত্র চিকিৎসক, মুমূষুর্র মিত্র দান”। তারপর যক্ষ প্রশ্ন করলেন, “কি ত্যাগ করলে লোকপ্রিয় হওয়া যায়? কি ত্যাগ করলে শোক হয় না? কি ত্যাগ করলে মানুষ ধনী হয়? কি ত্যাগ করলে সুখী হয়?” তখন যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, “অভিমান ত্যাগ করলে লোকপ্রিয় হওয়া যায়, ক্রোধ ত্যাগ করলে শোক হয় না, কামনা ত্যাগ করলে ধনী হওয়া যায় এবং লোভ ত্যাগ করলে মানুষ সুখী হয়”। সর্বশেষে যক্ষ বললেন, “বার্তা কি? আশ্চর্য কি? পন্থা কি? সুখী কে?” যুধিষ্টির উত্তর দিলেন, “এই মহামোহ রূপ পাত্রে কাল (সময়) প্রাণিসমূহকে পাক করছে, সূর্য তার অগ্নি, রাত্রিদিন তার ইন্ধন (জ্বালানি) মাস-ঋতু তার দর্বী (হাতা) এটাই বার্তা। প্রাণিগণ প্রত্যহ মারা গিয়ে যমালয়ে যাচ্ছে, তা জেনেও সকলে চিরজীবী হতে চায় এর চেয়ে আশ্চর্য কি আছে? সাধুজন যে দিকে গেছেন তাই পন্থা। যে লোক ঋণী ও প্রবাসী না হয়ে দিবসের অষ্টম ভাগে (অর্থাৎ সন্ধ্যার সময়) শাক রন্ধন করেন, সেই সুখী”। তারপর যক্ষ যুধিষ্ঠিরকে বললেন যে, তিনি চার ভ্রাতার মধ্যে যে কোন একজনকে বাঁচাতে চান। যুধিষ্ঠির তখন নকুলকে বাঁচাতে বললেন। একথা শুনে যক্ষ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন যে, যুধিষ্ঠির সহোদর ভ্রাতাদের রেখে কেন বৈমাত্রেয় ভ্রাতা নকুলকে বাঁচাতে চান। তখন যুধিষ্ঠির বললেন, “কুন্তী ও মাদ্রী দুজনেই আমার পিতার পত্নী। তাঁদের দুজনরেই পুত্র থাকুক এই আমার ইচ্ছা”। তখন যক্ষ তাঁর উত্তর শুনে ধন্য হলেন এবং সব ভ্রাতাকেই প্রাণদান করলেন। এই যক্ষই হলেন যুধিষ্ঠিরের পিতা ধর্ম। যুধিষ্ঠির পিতার পরিচয় পেয়ে তাঁর নিকট এই বর চাইলেন যেন তাঁরা অজ্ঞাতবাসে থাকাকালে তাঁদের কেউ চিনতে না পারে। ধর্ম সে বর দিয়ে চলে গেলেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-১৬

    দ্বাদশ বর্ষ পূর্ণ হলে পাণ্ডবগণ অজ্ঞাতবাসের জন্য ধাম্যকে সঙ্গে নিয়ে ছদ্মবেশে মৎস্যদেশের বিরাট রাজার আশ্রয়ে আসলেন। সেখানে যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণ সেজে অক্ষক্রিড়া করে রাজার মনোরঞ্জনের দায়িত্ব নিলেন। ভীম রন্ধনশালার পাচক হলেন। অর্জুন বৃহন্নলা নাম ধরে নপুংসক সেজে রাজকন্যাকে নৃত্য শেখানোর দায়িত্ব নিলেন। নকুল হলেন অশ্বরক্ষক আর সহদেব হলেন গোরক্ষক। দ্রৌপদী রাজমহিষী সুদেষ্ণার পরিচারিকা হলেন। পঞ্চভ্রাতার ছদ্মনাম ছিল যথাক্রমে জয়, জয়ন্ত, বিজয়, জয়সেন ও জয়দ্বল এবং দ্রৌপদী সেখানে পরিচয় দিলেন সৌরন্ধ্রী নামে। কিছু দিন যেতে না যেতে বিরাট রাজার মন্ত্রী কীচকের কুদৃষ্টি পরে সৌরন্ধ্রী নামধারী দ্রে্রৗপদীর উপর। কীচক দ্রৌপদীকে লাঞ্ছিত করলে ভীম গোপনে কীচককে বধ করলেন আর রাজসভায় রটে গেল যে, সৌরন্ধ্রীর গন্ধর্বপতিরা কীচককে বধ করেছেন। এভাবে পাণ্ডবরা বিরাটরাজার প্রাসাদে গোপরেন ও ছদ্মবেশে বাস করতে লাগলেন।

    কিছুদিন পর দুর্যোধন ও কর্ণের মন্ত্রণায় ত্রিগর্তদেশের অধিপতি সুশর্মা বিরাট রাজার বহু গরুবাছুর হরণ করলেন। কৌরবরাও তার সাথে ছিলেন। যুধিষ্ঠর, ভীম, নকুল ও সহদেবের বিক্রমে সুশর্মা পরাজিত হল এবং গরুবাছুর ফিরিয়ে দিয়ে প্রাণভিক্ষা পেল। যুদ্ধ চলাকালে কৌরবরা বিরাট রাজার উত্তর দিকের গোশালা হতে ষাট হাজার গরু হরণ করল। দ্রৌপদীর পরামর্শে বিরাটপুত্র উত্তর বৃহন্নলা অজুর্নকে রথের সারথি করে সসন্যে গরু উদ্ধার করতে গেলেন। কিন্তু কৌরবদের পক্ষের মহাবীরদের দেখে উত্তর পলায়ন করতে চাইলে অজুর্ন তাঁর গতিরোধ করলেন এবং শমী বৃক্ষের উপরে রাখা তাঁদের অস্ত্রশস্ত্র উত্তরের সহায়তায় নামিয়ে আনলেন। অস্ত্রশস্ত্র দেখে উত্তর বৃহন্নলার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করলেন। তখন অজুর্ন তাঁর আসল পরিচয় দান করেন এবং অজুর্ন রূপে দর্শন দেন। তারপর উত্তরকে সারথি করে অজুর্ন কৌরবদের সাথে যুদ্ধ শুরু করলেন। তিনি ভীষ্ম, কৃপাচার্য, দ্রোণাচার্য, কর্ণ, দুর্যোধন, অশ্বথামা সহ অন্যান্য মহবীরদের পরাজিত করে গরু উদ্ধার করে বিরাট রাজার সভায় ফিরে আসেন। কৌরবরা অজুর্নকে চিনে ফেললেও সমস্যা হয়নি কারণ তখন বার বৎসর বনবাস ও এক বৎসর অজ্ঞাতবাস সমাপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তাঁরপর পাণ্ডবরা বিরাট রাজার নিকট একে একে পরিচয় দান করতে লাগলেন। পরিচয় পেয়ে বিরাট তাঁর কন্যা উত্তরাকে অজুর্নের সাথে বিবাহ দিতে চাইলেন কিন্তু শিষ্যা কন্যা তুল্য বলে অজুর্ন উত্তরাকে বিবাহ করতে রাজি হননি। তিনি তাঁর পুত্র অভিমন্যুর সাথে উত্তরার বিবাহ দেয়ার মত প্রকাশ করলেন। বিরাট রাজাও তাতে সম্মতি হলেন এবং উত্তরকে ও অভিমন্যুর সাথে বিবাহ দিলেন। বিবাহে কৃষ্ণ ও বলরামও উপস্থিত ছিলেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-১৭

    অভিমন্যু ও উত্তরার বিবাহের পর বিরাট রাজা সভায় কৃষ্ণ, বলরাম, সাত্বতবংশীয় সাত্যকি, কৃষ্ণপুত্র প্রদ্যুম্ন, শাল্ব, দ্রুপদ প্রমুখ মিলিত হলেন এবং পাণ্ডবদের রাজ্যলাভ কিভাবে হবে এই নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম চাইলেন কৌরবদের নিকট দূত পাঠাতে। তাঁরা ভাবলেন, দুর্যোধন যদি রাজ্য দিতে সম্মত হলে কৌরব ও পাণ্ডবদের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হবে না কিন্তু রাজ্য দিতে সম্মত না হলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়বে। তবে সাত্যকি ও দ্রুপদ চাইলেন কৌরবদের কাছে মাথা নত না করে যুদ্ধ করেই রাজ্য অধিকার করতে। কৃষ্ণ ও বলরাম তাঁদের অভিমত ব্যক্ত করে চলে গেলেন। তবে শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছা অনুসারে পাণ্ডবদের পক্ষ থেকে দুর্যোধনের নিকট দূত পাঠানো হল। কিন্তু দুর্যোধন বিনা যুদ্ধে রাজ্য ফিরিয়ে দিতে অসম্মত হওয়ায় যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ল। ফলে যুদ্ধের সংবাদ পৌঁছে দিতে পাণ্ডব ও কৌরব উভয় পক্ষ থেকে বিভিন্ন রাজ্যের রাজা-মহারাজাগণের নিকট দূত পাঠানো হল। তারপর বিভিন্ন রাজা-মহারাজাগণ তাঁদের মিত্রের পক্ষে যোগ দিতে লাগলেন। কৃষ্ণকে দলে নিতে দুযোর্ধন ও অজুর্ন উভয়ই একই দিনে তাঁর নিকট গেলেন। কৃষ্ণের শয়নকক্ষে অজুর্ন বসলেন তাঁর পায়ের কাছে আর দুর্যোধন বসলেন সিংহাসনে। কৃষ্ণ ঘুম থেকে জেগে প্রথমে অজুর্নকে দেখায় তিনি অজুর্নের পক্ষ নিলেন। দুযোর্ধনের সাথেও কৃষ্ণের আত্মীয়তা আছে অর্থাৎ কৃষ্ণপুত্র শাম্ব দুর্যোধনের জামাতা। এজন্য তিনি দুর্যোধনকেও নিরাশ করলেন না এবং তাঁর দশ কোটি নারায়ণী সেনা তাকে দিলেন। অজুর্ন ও দুর্যোধন উভয়ই খুশি মনে ফিরে এলেন।

    পাণ্ডবদের মাতুল মদ্ররাজ শৈল্য পাণ্ডবদের পক্ষে যুদ্ধে যোগদানের জন্য আসলেন কিন্তু দুর্যোধন তাঁকে ছল করে দলে নিয়ে নিলেন। মৎস্যরাজ বিরাট, পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ, সাত্বত বংশীয় সাত্যকি ছাড়াও পাণ্ডবদের পক্ষে যোগ দিলেন চেদিরাজ ধৃষ্টকেতু, জরাসন্ধপুত্র মগধরাজ জয়ৎসেন, কেকয়রাজ বংশীয় পঞ্চ-সহোদর, পাণ্ড্যরাজ সহ অনেক রাজা ও তাঁদের সৈন্য-সামন্ত। কৌরবদের পক্ষে যোগ দিলেন ভগদত্ত, সোমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবা, হৃদিকপুত্র কৃতবর্মা, সিন্ধুসৌবীরবাসী জয়দ্রথ সহ বিভিন্ন রাজাগণ। পাণ্ডবদের পক্ষে সাত অক্ষৌহিনী আর কৌরবদের পক্ষে এগার অক্ষৌহিনী সেনা সংগৃহীত হল। কৌরব সেনারা হস্তিনাপুর ছাড়াও পঞ্চনদ, কুরুজাঙ্গল, রোহিতকারণ্য, মরুপ্রদেশ, অহিচ্ছত্র, কালকূট, গঙ্গাতীর, বারণ, বাটধান, পার্বতদেশ প্রভৃতি স্থানে অবস্থান করলেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-১৮

    সেনা সংগ্রহের পরও যুদ্ধ থামানোর জন্য দ্রুপদের পুরোহিতকে পাণ্ডবদের দূত করে সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে হস্তিনাপুর পাঠানো হল। কর্ণ, দুর্যোধনাদি কৌরব বিরোধিতা করলেও ভীষ্মের পরামর্শে ধৃতরাষ্ট্র মন্ত্রী সঞ্জয়কে দূত করে পাণ্ডবদের নিকট পাঠালেন তাঁদের মতামত জানানোর জন্য। সঞ্জয় পাণ্ডবদের নিকট এলে পাণ্ডবরা গোটা রাজ্যের পরিবর্তে শুধুমাত্র পাঁচটি প্রদেশ বা পাঁচটি গ্রাম চাইলেন। পাণ্ডবদের এই উদারতা সত্যি প্রশংসনীয়। সঞ্জয় হস্তিনাপুরে এসে ধৃতরাষ্ট্রের নিকট পাণ্ডবদের মতামত জানালেন। কিন্তু কর্ণ, দুর্যোধনাদি কৌরবরা যুদ্ধ ছাড়া সূচাগ্র মাটি দিতেও অসম্মত হলেন। তখন ভীষ্ম ও বিদুরের নিষেধ সত্ত্বেও ধৃতরাষ্ট্র কর্ণ ও দুযোর্ধনের অহংকার আর ঔদ্ধত্যের নিকট নতি স্বীকার করে যুদ্ধে মত দিলেন। যুধিষ্ঠির ও শ্রীকৃষ্ণ যুদ্ধের বিপক্ষে অর্থাৎ শান্তির পক্ষে অবস্থান নিলেন। তাই যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে শ্রীকৃষ্ণ নিজেই হস্তিনাপুর গেলেন। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, বিদুর সহ অনেকই যুদ্ধের বিপক্ষে ছিলেন। ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীও জানতেন যে, তাঁর পুত্রগণ লোভী ও ইর্ষাপরায়ণ এবং যুদ্ধে তাঁদের পরাজয় নিশ্চিত। কিন্তু পুত্রগণ তাঁদের বশে না থাকায় তাঁরা পুত্রদের কুকার্যে বাধা দিতে পারলেন না। যা হোক, দুর্যোধন কারও কথায় কর্ণপাত না করে কৃষ্ণের সন্ধির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল এবং কৃষ্ণকে বন্দি করতে চাইল। কৃষ্ণ তখন সভাস্থ সকলকে তাঁর ঐশীমূর্তি দেখালে দর্যোধন নিরস্ত হল। যাওয়ার আগে কৃষ্ণ কর্ণকে পাণ্ডবদের কাছে নিয়ে যেতে চাইলেও কর্ণ কৃতজ্ঞতাবশত দুর্যোধনের বিরুদ্ধে যেতে চাইলেন না। পরিশেষে কৃষ্ণকে যুদ্ধের বার্তা নিয়েই পাণ্ডবদের নিকট ফিরে আসতে হল।

   কুন্তী কর্ণের নিকট গিয়ে তাঁর জন্মবৃত্তান্ত বললেন এবং জানালেন যে, কর্ণ তাঁরই পুত্র। পরে কুন্তী কর্ণকে পাণ্ডবদের পক্ষ নিতে বললেন, কিন্তু কর্ণ তাঁর মাতার আজ্ঞা পালন করতে অসম্মত হলেন। তবে কথা দিলেন অজুর্ন ভিন্ন অন্য চার ভ্রাতাকে তিনি আঘাত করবেন না। অবশেষে কুন্তী কর্ণকে আশীর্বাদ করে ফিরে এলেন। যুদ্ধ অনিবার্য হওয়ায় পাণ্ডব ও কৌরব উভয়পক্ষ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হল এবং কুরুক্ষেত্রে হিরন্বতী নদীর নিকটে সন্নিবেশিত হল। শুরু হয়ে গেল পাণ্ডব ও কৌরবদের যুদ্ধ। যুধিষ্ঠির যুদ্ধের আগে ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ ও শল্যের নিকট গেলেন এবং তাঁদের আশীর্বাদ নিয়ে ফিরে আসলেন। গবল্গণপুত্র সঞ্জয় ব্যাস কতৃর্ক দিব্যচক্ষু লাভ করলেন এবং যুদ্ধের খবরাখবর ধৃতরাষ্ট্রকে জানানোর দায়িত্ব নিলেন। সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রের সারথী ছিলেন পরে তিনি মন্ত্রী পদ লাভ করেন। অজুর্ন আত্মীয়বধে রাজি হলেন না কিন্তু কৃষ্ণ তাঁকে বুঝিয়ে রাজি করালেন। কৃষ্ণ অস্ত্র না ধরে অজুর্নের রথের সারথি হলেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-১৯

    শুরু হয়ে গেল কুরু-পাণ্ডবের মহারণ। প্রথম দিনের যুদ্ধে বিরাট পুত্র উত্তর এবং নরশাদূর্ল শ্বেতের মৃত্যু হল। দ্বিতীয় দিনে যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে ধৃষ্টদ্যুম্ন কতৃর্ক ক্রৌঞ্চারুণ নামক ব্যূহ রচনা করা হল এবং পাণ্ডব ও ভীস্মের পরাক্রমে দুপক্ষের অসংখ্য সৈন্য নিহত হল। তৃতীয় দিনে ভীষ্ম ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করলেন। তাঁর পরাক্রমে অসংখ্য পাণ্ডব-সৈন্য নিহত হলেন। কিছু সৈন্য পলায়ন করতে উদ্যত হলেন। ভীষ্মকে এরকম পাণ্ডব-সৈন্য বধ করতে দেখে শ্রীকৃষ্ণ ক্রোধান্বিত হয়ে সুদর্শন চক্র নিয়ে ভীষ্মের দিক ধাবিত হলেন। কিন্তু অজুর্ন তাঁকে গতিরোধ করে শান্ত করেন। পরে কৃষ্ণ তুষ্ট হয়ে রথে উঠে তাঁর পাঞ্চজন্য শঙ্খ বাজাতে শুরু করেন। এরপর অজুর্নের মাহেন্দ্র অস্ত্রে বহু কৌরব সৈন্য নিহত হয় এবং সূর্যাস্তের পর তৃতীয় দিনের যুদ্ধ মেষ হয়। চতুর্থ দিনে ভীমসেন সেনাপতি, জলসন্ধ, সুষেণ, ভীমরথ, সুলোচন প্রভৃতি দুর্যোধনের ভ্রাতাগণকে বধ করলেন।

    পঞ্চম দিনে পাণ্ডবগণ শ্যেন ব্যূহ এবং কৌরবগণ মকর ব্যূহ রচনা করেন। সাত্যকির দশপুত্র ভূরিশ্রবা কতৃর্ক নিহন হলেন এবং অজুর্ন শরাঘাতে পঁচিশ হাজার কৌরব সৈন্য বধ করলেন। ষষ্ঠ দিনে পাণ্ডব সেনাপতি ধৃষ্টদ্যুম্ন মকর ব্যূহ এবং কৌরব সেনাপতি ভীষ্ম ক্রৌঞ্চ ব্যূহ রচনা করলেন। ভীমের সঙ্গে ভীষ্ম-দ্রোণের যুদ্ধে দুপক্ষের বহু সৈন্য নিহত হয়। সুভদ্রাপুত্র অভিমন্যু এবং দ্রৌপদীপুত্র শ্রুতকর্ম, সতসোম, শ্রুতসেন ও শতানীকের শরাঘাতে দুর্যোধনের চার ভ্রাতা বিকর্ণ, দুমুর্খ, জয়ৎসেন ও দুস্কর্ণ নিহত হয়। সপ্তম দিনে দ্রোণের বাণে বিরাটপুত্র শঙ্খ নিহত হন এবং অজুর্নপুত্র ইরাবান ও নকুল সহদেবের পরাক্রমে বহু কৌরব সৈন্য নিহত হয়। অষ্টম দিনের যুদ্ধে অজুর্নপুত্র ইরাবান কতৃর্ক শকুনির ছয় ভ্রাতা নিহত হয়। পরে কৌরব পক্ষের অলম্বুষ রাক্ষস ইরাবানকে বধ করে। তারপর ভীমপুত্র ঘটোৎকচ কতৃর্ক বহু সৈন্য নিহত হয় এবং বহু সৈন্য পলায়ন করে।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-২০   

    যুদ্ধের নবম দিনে ভীষ্ম ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেন এবং তাঁর পরাক্রমে পাণ্ডবরা ভীত ও দুর্বল হয়ে পড়েন। তখন যুধিষ্ঠিরাদি পাণ্ডবরা শ্রীকৃষ্ণকে সাথে করে পিতামহ ভীষ্মের কাছে যান এবং প্রণাম করে তাঁর বধের উপায় জানতে চান। তখন ভীষ্ম বলেন যে, শিখণ্ডীকে সম্মুখে রেখে অর্জুন যেন তাঁর প্রতি শর নিক্ষেপ করেন। ভীষ্ম শিখণ্ডীর বিরূদ্ধে অস্ত্র ধরবেন না। সে সুযোগে অজুর্ন তাঁকে শরবিদ্ধ করবেন। পরে তিনি স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করবেন। ভীষ্ম কতৃর্ক তাঁর মৃত্যুর উপায় জেনে পাণ্ডবরা ফিরে আসলেন। এই শিখণ্ডীর বিরুদ্ধে ভীষ্মের অস্ত্র না ধরার একটা ইতিহাস আছে। এই শিখণ্ডী পূর্বজন্মে কাশীরাজের কন্যা অম্বা ছিলেন। অম্বা শাল্বরাজের বাগদত্তা জেনে ভীষ্ম অম্বাকে ছেড়ে দেন এবং তাঁর অপর দুই ভগিনীকে ভ্রাতা বিচিত্রবীর্যের সাথে বিবাহ দেন। কিন্তু অম্বা ভীষ্ম কতৃর্ক অপহৃত হওয়ায় শাল্বরাজ তাঁকে পরিত্যাগ করেন। পরে অম্বা ভীষ্ম বধের জন্য তপস্যা করতে থাকেন। মহাদেবের বরে অম্বা দ্রুপদের কন্যা শিখণ্ডী হয়ে জন্মগ্রহণ করলেও পরে পুরুষ হয়ে যান।

    ভীষ্ম শিখণ্ডীর পূর্বজন্মের ইতিহাস জানতেন এবং শিখণ্ডী পূর্বজন্মে নারী ছিলেন বলে তিনি স্থির করলেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবেন না। দশম দিনে ভীষ্মের পরামর্শ মতে শিখণ্ডীকে সম্মুখে রেখে অজুর্ন ভীষ্মের প্রতি শরবর্ষণ করতে লাগলেন। শিখণ্ডী ভীষ্মকে শর নিক্ষেপ করলেও ভীষ্ম শিখণ্ডীর বিরূদ্ধে অস্ত্র উঠালেন না। অবশেষে অজুর্ন বহু শরে ভীষ্মের দেহ বিদ্ধ করে ভূপাতিত করলেন। এভাবে ভীষ্মের শরশয্যা রচিত হল। ভীষ্মদেব পিতা কতৃর্ক ইচ্ছামৃত্যুর বর পেয়েছিলেন। উত্তরায়ণের সময় মৃত্যুবরণ করলে সদ্গতি লাভ করা যায়। যুদ্ধের সময় দক্ষিণায়ণ চলছিল। তাই ভীষ্ম উত্তরায়ণের সময় মৃত্যুর ইচ্ছা করলেন। ভীষ্মের শরশয্যা গ্রহণের পর দ্রোণাচার্যকে সেনাপতি করা হল।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-২১

    একাদশ দিন দ্রোণের হাতে পঞ্চালবীর ব্যাঘ্রদত্ত ও সিংহসেন সহ অনেক সৈন্য নিহত হল। দ্বাদশ দিনে ত্রিগর্তরাজ সুশর্মা, সত্যরথ, সত্যবর্মা প্রভৃতি সংশপ্তকগণ অর্জুনকে আক্রমন করে। অর্জুনের দেবদত্ত নামক শঙ্খের মহারবে সংশপ্তকবাহিনী ভীত ও দুর্বল হয়ে পড়ল তাঁর শরবর্ষণে অনেক সংশপ্তকগণ প্রাণ হারাল। পরে অজুর্ন ভগদত্তকে আক্রমন করলেন। ভগদত্ত বৈষ্ণবাস্ত্র নিক্ষেপ করলে কৃষ্ণ তা বুকে গ্রহণ করলেন এবং ঐ অস্ত্র মাল্যে পরিবর্তিত হল। তারপর অজুর্ন ভগদত্তকে বধ করেন।

    ত্রয়োদশ দিনে সেনাপতি দ্রোণ চক্রব্যূহ রচনা করলেন। এই চক্রব্যূহ ভেদ করার কৌশল কেবলমাত্র অজুর্ন, কৃষ্ণ, কৃষ্ণপুত্র প্রদ্যুম্ন আর অভিমন্যুই জানতেন। অজুর্ন সংশপ্তকবাহিনীর সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত এবং প্রদ্যুম্ন অন্যত্র যুদ্ধে রত তাই কেবল অভিমন্যুই রইলেন চক্রব্যূহ ভেদ করার জন্য। অভিমন্যু চক্রব্যূহ ভেদ করার কৌশল জানলেও বিপদকালে ব্যূহ থেকে বের হয়ে আসার কৌশল জানতেন না। যুধিষ্ঠির ও ভীম অভিমন্যুকে বের করে আনবেন এমন প্রতিশ্রম্নতি দিয়ে তাঁকে চক্রব্যূহ ভেদ করার জন্য পাঠালেন। অভিমন্যু চক্রব্যূহে প্রবেশ করে দুঃশাসন, শল্য প্রভৃতি মহারথীকে পরাজিত করলেন এবং কর্ণকেও পীড়িত করলেন। অভিমন্যুর পরাক্রমে কৌরবদের অসংখ্য সৈন্য নিহত হল। তখন দুর্যোধনের নির্দেশে দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বথামা, বৃহদ্বল ও কৃতবর্মা এই ছয় জন এক সাথে বালক অভিমন্যুকে আক্রমন করলেন। যুদ্ধের নিয়ম ভঙ্গ করে কাপুরুষের মত নিষ্ঠুরভাবে তাঁরা অভিমন্যুকে হত্যা করলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন, দ্রুপদ, শিখণ্ডী, যুধিষ্ঠির, ভীম প্রভৃতি পাণ্ডবগণ অভিমন্যুকে রক্ষা করতে এলে চক্রব্যূহের দ্বাররক্ষক জয়দ্রথ তাঁদের বাধা দেয়। ফলে অভিমন্যুকে একাই যুদ্ধ করে বীরের মত মৃত্যুবরণ করতে হল।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-২২

    অজুর্ন সংশপ্তকগণকে বধ করে ফিরে এসে অভিমন্যুর মৃত্যুর বর্ণনা শুনলেন। সব শুনে অজুর্ন ক্রোধের সাথে উচ্চস্বরে প্রতীজ্ঞা করেন যে, তিনি পরের দিন সূর্যাস্তের পূর্বেই জয়দ্রথকে বধ করবেন এবং বধ করতে না পারলে অগ্নিকুণ্ডে প্রাণ বিসর্জন দেবেন। অজুর্নের প্রতিজ্ঞার কথা শুনে জয়দ্রথ ভয় পেয়ে গেলেন। পরের দিন জয়দ্রথকে রক্ষা করার জন্য দ্রোণের পশ্চাতে ছয় ক্রোশ দূরে সৈন্যবেষ্টিত করে রাখা হল। অজুর্ন সামনের সব সৈন্যকে পরাস্ত করে জয়দ্রথের নিকট যেতে উদ্যত হলেন। কিন্তু তখন সূর্য প্রায় অস্তাচলে যাওয়ার উপক্রম হল। দুর্যোধন, কর্ণ, কৃপ, প্রভৃতি মহারথীদের অতিক্রম করে জয়দ্রথকে বধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লে কৃষ্ণ যোগবলে সূর্যকে আবৃত করেন ফলে সূর্যাস্ত না হলেও সকলে মনে করল সূর্যাস্ত হয়ে গেছে। সৈন্যরা যখন ধুলি ও অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেল, সে সুযোগে কৃষ্ণের পরামর্শ অনুযায়ী অজুর্ন কৃপ, কর্ণ, শল্য প্রভৃতিকে শরাঘাতে বিতাড়িত করে জয়দ্রথের প্রতি শরনিক্ষেপ করলেন। ঐ শরে জয়দ্রথের মস্তক ছেদ হয়ে তার পিতা বৃদ্ধক্ষত্রের কোলে পড়ল। তখন সকলে দেখল যে সূর্যাস্ত তখনও হয়নি। ঐ দিন ভীম দুর্যোধনের একত্রিশ ভ্রাতাকে বধ করলেন এবং সাত্যকি ভূরিশ্রবার মস্তক ছেদ করলেন। ভীমপুত্র ঘটোৎকচের মায়াযুদ্ধে কৌরবদের ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে গেল। অগত্যা কর্ণ অর্জুনকে বধ করার জন্য তুলে রাখা ইন্দ্রপ্রদত্ত বৈজয়ন্তী শক্তি নিক্ষেপ করলেন। শক্তির আঘাতে ঘটোৎকচ মৃত্যুবরণ করল কিন্তু মরার আগে সে বিশাল আকৃতির দেহ নির্মাণ করেছিল এবং ঐ বিশাল আকৃতির দেহ ভূপাতিত হওয়ার ফলে কৌরবদের একাংশ পিষ্ট হয়ে মারা গেল।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-২৩

    পঞ্চদশ দিনে দ্রোণের পরাক্রমে অগনিত পাণ্ডব সৈন্য নিহত হতে লাগল। তখন কৃষ্ণ অজুর্নকে বললেন যে, দ্রোণ অবধ্য, তিনি যদি অস্ত্র ত্যাগ না করেন তবে কেউ তাঁকে বধ করতে পারবে না। তাই পাণ্ডবগণ কৃষ্ণের পরামর্শে কৌশলের আশ্রয় নিল। ভীম মালবরাজ ইন্দ্রবর্মার অশ্বত্থামা নামের এক হস্তী বধ করে দ্রোণকে গিয়ে বললেন, অশ্বত্থামা হত হয়েছেন। দ্রোণ বিশ্বাস করলেন না, কারণ তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা অজেয় এবং অমর। তখন উপায় না দেখে কৃষ্ণের পরামর্শে যুধিষ্ঠির দ্রোণের নিকট গিয়ে বললেন, “অশ্বত্থামা হতঃ” অর্থাৎ অশ্বত্থামা হত হয়েছেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন “ইতি কুঞ্জরঃ” অর্থাৎ এই নামের হস্তী। যে যুধিষ্ঠিরের রথ সব সময় ভূমি থেকে চার আঙুল উপরে থাকত, মিথ্যা বলায় তাঁর রথ তখন ভূমি স্পর্শ করল। দ্রোণ জানতেন যুধিষ্ঠির কখনও মিথ্যা বলেন না, তাই তিনি তাঁর কথা বিশ্বাস করে পুত্রশোকে মুহ্যমান হলেন এবং অস্ত্রত্যাগ করলেন। তখন ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁর মুণ্ড ছেদন করলে তাঁর মৃতদেহ হতে দিব্যজ্যোতি নির্গত হয়ে ব্রহ্মলোক পথে চলে গেল। দ্রোণ অকারণে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে অসংখ্য পাণ্ডবসৈন্য নিহত করেছিলেন, যার ফল স্বরূপ তাঁকে এভাবে প্রাণ বিসর্জন দিতে হল।

    দ্রোণ নিহত হওয়ার পর অশ্বত্থামা ক্রোধান্বিত হয়ে পাণ্ডবগণের দিকে নারায়ণাস্ত্র প্রয়োগ করে কিন্তু কৃষ্ণের শেখানো কৌশল অবলম্বন করে পাণ্ডবরা নারায়ণাস্ত্র নিবৃত্ত করেন। ষোড়শদিনে কৌরবরা কর্ণকে সেনাপতি করে যুদ্ধ শুরু করলেন। ঐ দিন পাণ্ডবরা অশ্বত্থামা ও দুঃশাস সহ বহু কৌরব সৈন্য বধ করলেন। সপ্তদশ দিনে ভীম দুর্যোধনের এগার ভ্রাতাকে হত্যা করলেন। ঐ দিন অজুর্ন ও কর্ণের মধ্যেও তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হল। যুদ্ধের এক পর্যায়ে কর্ণের রথের চাঁকা ভূমিতে বসে যায়, তারপরও কর্ণ যুদ্ধ চালিয়ে যান। কর্ণ এক ভয়ঙ্কর বাণে অজুর্নের বাহু বিদ্ধ করায় অজুর্ন সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। এই সুযোগে কর্ণ রথের চাকা দুই হাত দিয়ে তুলবার চেষ্টা করতে করেন। তখন অজুর্ন সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে কর্ণের উদ্দেশ্যে অঞ্জলিক বাণ নিক্ষেপ করলে কর্ণের মস্তক ছেদিত হয়। তখন কর্ণের দেহ থেকে একটি তেজঃ আকাশে উঠে সূর্যমণ্ডলে প্রবেশ করে। অষ্টাদশ দিনে শল্যকে সেনাপতি করে কৌরবরা যুদ্ধ আরম্ভ করলেন। যুধিষ্ঠিরের নিক্ষেপ করা শক্তিঅস্ত্রে শল্য নিহত হলেন এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন কতৃর্ক ভল্লের আঘাতে শাল্ব নিহত হলেন। সহদেব শকুনি ও তাঁর পুত্র উলূককে হত্যা করলেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-২৪

    অষ্টাদশ দিনের যুদ্ধে কৌরবপক্ষের এগার অক্ষৌহিণী সেনার সব বিনাশ হল। পাণ্ডবদের পক্ষে দুহাজার রথ, সাতশ হস্তী, পাঁচ হাজার অশ্ব ও দশ হাজার পদাতি অবশিষ্ট ছিল। কৌরবদের পক্ষে কেবল কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা, কৃতবর্মা ও দুর্যোধন জীবিত ছিলেন। দুর্যোধন প্রাণ বাঁচানোর জন্য দ্বৈপায়ন হৃদে লুকালেন। পাণ্ডবগণ কতিপয় ব্যাধের নিকট দুর্যোধনের সংবাদ পেয়ে দ্বৈপায়ন হ্রদে গেলেন এবং যুধিষ্ঠির তাকে যুদ্ধে আহবান জানালেন। দুর্যোধনকে অসহায় ও নিরস্ত্র অবস্থায় দেখে যুধিষ্ঠির দয়া-পরবশ হয়ে তাকে একটা সুযোগ দিলেন যে, তিনি যদি পাণ্ডবদের যে কোন একজনকে পরাজিত করতে পারে, তবে রাজ্য তারই হবে। দুর্যোধন তখন ভীমকে যুদ্ধে আহ্বান জানল। তারপর শুরু হল ভীম ও দুর্যোধনের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ। দুযোর্ধনকে ন্যায়সঙ্গতভাবে গদাযুদ্ধে পরাজিত করা দুঃসাধ্য ছিল। অবশেষে শ্রীকৃষ্ণ ও অজুর্নের ইশারায় ভীম দুর্যোধনকে উরুতে আঘাত করে ভূপাতিত করেন। অশ্বত্থামা দুর্যধনকে দেখতে এসে তাঁর সামনে শপথ করলেন যে, তিনি পাণ্ডবদের বিনাশ করবেন। এদিকে শ্রীকৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট ও গান্ধারীকে নানা উপদেশ দিয়ে তাঁদের পুত্রশোক লাঘব করলেন।

    পাণ্ডবশিবিরে যখন সমস্ত সৈন্য রথী-মহারথীরা ঘুমাচ্ছিলেন তখন অশ্বত্থামা প্রথমে ঘুমন্ত ধৃষ্টদ্যুম্নকে পদদলিত করে হত্যা করেন। পরে মহাদেব প্রদত্ত খড়গ দিয়ে উত্তমৌজা, যুধামন্যু, শিখণ্ডী, দ্রৌপদীর পুত্রগণ সহ পাণ্ডবশিবিরের সকল সৈন্য, হস্তী ও অশ্ব বধ করলেন অথচ সবাই দেখেলেন যে, কালরাত্রিরূপা কালী সকলকে বধ করছেন। পাণ্ডবপক্ষের শুধু পঞ্চপাণ্ডব, কৃষ্ণ ও সাত্যকি বেঁচে রইলেন। এই হত্যাকাণ্ডের খবর অশ্বত্থামা দুর্যোধনকে দিলে আহত দুর্যোধন সুখী মনে মৃত্যুবরণ করেন। অশ্বত্থামাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ভীম অজুর্ন, শ্রীকৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠির তাঁর নিকট এলে সে দ্রোণপ্রদত্ত ব্রহ্মশির অস্ত্র নিক্ষেপ করেন। অজুর্নও আত্মরক্ষার্থে ব্রহ্মশির অস্ত্র নিক্ষেপ করেন। এই অস্ত্র বড় ভয়ানক যা পৃথিবীকে দগ্ধ করে ফেলতে পারে। তখন ব্যাসের নির্দেশে অজুর্ন ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রত্যাহার করলেও অশ্বত্থামা তা প্রত্যাহার করতে ব্যর্থ হল। তারপর অশ্বত্থামা ব্যাসের নির্দেশে তার মস্তকের মহামূল্যবান মণি পাণ্ডবদের দিয়ে প্রাণ রক্ষা করল এবং ব্রহ্মশির অস্ত্র পাণ্ডবনারীদের গর্ভে নিক্ষেপ করল। ঐ অস্ত্রে অজুর্নের পুত্রবধু উত্তরার গর্ভের সন্তান বিনষ্ট হবে কিন্তু কৃষ্ণ তাঁকে বাঁচিয়ে তোলার প্রতিশ্রম্নতি দেন। কৃষ্ণ অশ্বত্থামাকে সহস্রর বৎসর জনহীন দেশে অসহায় ব্যাধিগ্রস্ত ও পূয-শোণিতগন্ধী হয়ে বিচরণ করার অভিশাপ দেন।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-২৫

    ধৃতরাষ্ট্র হস্তিনাপুর ত্যাগ করার পূর্বে যুধিষ্টিরকে আলিঙ্গন করলেন এবং ভীমকে খুজলেন। কৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্রের দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে লৌহ-নির্মিত ভীমকে পাঠালেন। অযুত হস্তীর মত শক্তিশালী ধৃতরাষ্ট্র সেই লৌহমূর্তিকে অলিঙ্গন করে চূর্ণ করে ফেললেন এবং ভাবলেন ভীম বধিত হয়েছে। তখন কৃষ্ণ তাঁকে জানালেন ওটা আসল ভীম নয়, লোহার ভীম। গান্ধারী যুধিষ্ঠিরকে অভিশাপ দিতে চাইলে ব্যাস তাঁকে বললেন, “অষ্টাদশ দিন যুদ্ধে প্রতিদিনই দুর্যোধন তোমাকে বলত মাতা, আমি শত্রুদেরর সাথে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি, আমাকে আশীর্বাদ করুন। তুমি প্রতিদিনই পুত্রকে বলতে যে পক্ষে ধর্ম সেই পক্ষেরই জয় হোক। কল্যাণী তুমি চিরদিন সত্য কথাই বলেছ”। ব্যাসের উপদেশে গান্ধারীর ক্রোধ দূর হল। কিন্তু তারপরও তিনি চক্ষুর আবরণবস্ত্রের অন্তরাল দিয়ে যুধিষ্ঠিরের নখের দিকে দৃষ্টিপাত করায় যুধিষ্ঠিরের নখ কুৎসিত হয়ে যায়। তারপর গান্ধারী শ্রীকৃষ্ণকে অভিশাপ দিলেন যে, তাঁর যদুবংশ ধ্বংস হবে। শ্রীকৃষ্ণ সহাস্যে সে অভিশাপ মাথা পেতে নিলেন।

    যুধিষ্ঠির অভিষিক্ত হওয়ার পর পিতামহ ভীষ্মের নিকট যান এব নানা ধর্মোপদেশ লাভ করেন। আটান্ন দিন শরশয্যায় কাটানোর পর ভীষ্ম কৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে স্বর্গারোহন করেন। কৃষ্ণ ও সুভদ্রা দ্বারকায় ফিরে গিয়ে বসুদেবকে যুদ্ধের সব কাহিনী খুলে বললেন। তারপর যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেদ যজ্ঞের সময় শ্রীকৃষ্ণ, সুভদ্রা, সাত্যকি, প্রদ্যুম্ন, শাম্ব, বলরাম প্রমুখ হস্তিনাপুর আসেন। ব্রহ্মশির অস্ত্রের তেজে উত্তরার গর্ভে এক মৃতপুত্রের জন্ম হয়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বাঁচিয়ে তোলেন। ভরতবংশ পরিক্ষীণ হলে অভিমন্যুর এই পুত্র জন্মেছে বলে পুত্রের নাম পরিক্ষিৎ রাখা হয়েছিল।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-২৬

    যুধিষ্ঠির অভিষিক্ত হওয়ার পর পনের বৎসর পর্যন্ত ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতি ও পরামর্শ নিয়ে রাজ্য শাসন করতেন। তারপর ধৃতরাষ্ট্র তপস্যার জন্য বনে চলে যান। গান্ধারী ও কুন্তিও তাঁর সাথে বনে যান। দুই বছর পর ধৃতরাষ্ট্র দাবানলের অগ্নিতে প্রাণ বিসর্জন দেন। তারপর গান্ধারী ও কুন্তিও প্রাণ ত্যাগ করেন। যুধিষ্ঠিরের রাজ্যলাভের ছত্রিশ বছর কেটে যাওয়ার পর যদুবংশ ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়। সাত্যকি মদ্যপ অবস্থায় কৃতবর্মার শিরচ্ছেদ করেন এবং অন্যান্য লোকদেরও বধ করতে থাকেন। তখন ভোজ ও অন্ধকগণ সাত্যকিকে উচ্ছিষ্ট ভোজনপাত্র দিয়ে মারতে উদ্যত হন। প্রদ্যুম্ন সাত্যকিকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হন। এভাবে যদুবংশে নিজেদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি হয় এবং তাঁরা পরস্পরকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। মহাকাল আসন্ন জেনে কৃষ্ণ ও বলরাম নির্বিকার থাকেন। বলরামের দেহত্যাগের পর কৃষ্ণ বুঝতে পারলেন তাঁরও দেহত্যাগের সময় এসেছে। তিনি বনমধ্যে যোগ অবলম্বন করে শয়ান হলেন তখন জরা নামের এক ব্যাধ মৃগ মনে করে কৃষ্ণের পদতল শরবিদ্ধ করে। শ্রীকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণে দেবতা, ঋষি, গন্ধর্ব প্রভৃতি সকলে স্তুতি করতে থাকেন এবং ইন্দ্র অভিনন্দন তাঁকে জানান।

মহাভারতের কাহিনী : অংশ-২৭

    দারুকের মুখে যদুবংশ ধ্বংসের বর্ণনা শুনে অজুর্ন দ্বারকায় যাত্রা করলেন। শ্রীকৃষ্ণের দেহত্যাগের পর অজুর্ন তাঁর স্ত্রীগণ ও অন্যান্য পতিপুত্রহীনা নারীদের রক্ষা করার জন্য তাঁদের নিয়ে দ্বারকা থেকে কুরুক্ষেত্রের দিকে রওনা হন। অজুর্ন যাদবনারীদের দ্বারকা থেকে নিয়ে আসার পর সে স্থান সমুদ্রে প্লাবিত হয়। আসার পথে পঞ্চনদ নামক স্থানে আভীর দস্যুগণ যাদবনারীদের হরণ করতে আসে। অজুর্ন অনেক চেষ্টা করেও সব যাদবনারীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হন এবং যাদেরকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন তাঁদেরকে এনে মার্তিকাবত নগর ও ইন্দ্রপ্রস্থে রাখেন। অজুর্ন কৃষ্ণের পৌত্র বজ্রকে ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্য দান করেন। তারপর কৃষ্ণের পত্নী রুক্মিণী, গান্ধারী, শৈব্যা, হৈমবতী ও জাবতী অগ্নিকুণ্ডে প্রাণ বিসর্জন দিলেন। সত্যভামা এবং অন্যান্য স্ত্রীগণ হিমালয়ের পরে কলাপ গ্রামে গিয়ে কৃষ্ণের ধ্যান করতে লাগলেন।

    শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম দেহত্যাগের পর যুধিষ্ঠির তাঁদের শ্রাদ্ধকার্য সম্পন্ন করলেন এবং বুঝতে পারলেন যে, তাঁদেরও দেহত্যাগের সময় এসে গেছে। তাঁরপর পরীক্ষৎকে রাজ্যে অভিষিক্ত করে এবং যুযুৎসুর উপর রাজ্যপালনের ভার দিয়ে পঞ্চ-পাণ্ডব ও দ্রৌপদী হস্তিনাপুর ত্যাগ করলেন। পঞ্চ-পান্ডব ও দ্রৌপদী উপবাস করে পূর্ব দিকে রওনা হলেন। একটা কুকুরও তাঁদের সাথে ছিল। পান্ডবগণ হিমালয় পার হয়ে মেরু পর্বত দর্শন করে চলতে লাগলেন এমন সময় দ্রৌপদী ভূপাতিত হলেন। যুধিষ্ঠির ভীমকে বললেন, অজুর্নের প্রতি দ্রৌপদীর বিশেষ পক্ষপাত থাকায় তিনি ভূপতিত হলেন। সহদেব পড়ে গেলে যুধিষ্ঠির ভীমকে বোঝালেন যে, সহদেব নিজেকে পন্ডিত মনে করে গর্ব করত বলে তাঁরও পতন হল। তারপর নকুল পড়ে গেলে যুধিষ্ঠির ভীমকে বোঝালেন যে, নকুলের রূপের অহংকারই তাঁর পতনের কারণ। কিছুক্ষণ পর অজুর্ন পড়ে গেলে যুধিষ্ঠির ভীমকে বললেন যে, অজুর্ন নিজেকে পৃথিবী শ্রেষ্ঠ বীর মনে করতেন বলে তাঁর পতন হয়েছে। তারপর ভীম পড়ে গেলে যুধিষ্ঠির ভীমকে বললেন, অতি ভেজন আর শক্তির গর্বের জন্য তোমার পতন হয়েছে। তখন ইন্দ্র রথে করে তাঁকে স্বর্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসলেন। ইন্দ্র যুধিষ্ঠিরকে রথে উঠতে বললে যুধিষ্ঠির কুকুরটিকে ফেলে রেখে একা স্বর্গে যেতে চাইলেন না। তখন কুকুররূপী ধর্ম নিজের রূপে দেখা দিলেন। সামান্য এক কুকুরের জন্য যিনি স্বর্গত্যাগ করতে পারেন তাঁর মত ধার্মিক আর কে থাকতে পারে? ধর্ম যুধিষ্ঠিরের মহত্বে তুষ্ট হলেন এবং সশরীরে স্বর্গে গমনের নির্দেশ দিলেন। স্বর্গে গিয়ে তিনি ভ্রাতাগণকে না দেখতে পাওয়ায় তাঁদের দেখার ইচ্ছা করেন। তাঁরপর দেবদূতগণ যুধিষ্ঠিরকে নরকে নিয়ে গেলে সেখানে তিনি ভ্রাতাগণের কণ্ঠস্বর শ্রবণ করেন। তাঁরপর যুধিষ্ঠির আকাশগঙ্গায় স্নান করে মনুষ্যদেহ ত্যাগ করে দিব্যদেহ ধারণ করে স্বর্গে যান এবং সেখানে গিয়ে তাঁর ভ্রাতাগণ ও দ্রৌপদী সহ অন্যান্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এভাবে মহাভারতের কাহিনী সমাপ্ত হয়।

(আমা কর্তৃক লিখিত “হিন্দুধর্মের সারকথা” পুস্তক থেকে সঙ্কলিত)

এই ওয়েবসােইটের সকল ধর্মীয় পোস্ট  পড়ার জন্য এই <পোস্ট দেখুন> অংশে ক্লিক করুন

আরও পড়ুন

ঈশ্বরতত্ত্ব










 হিন্দু দেবতা




 

রামায়ণ কাহিনী

রামায়ণ কাহিনী

    মহর্ষি বাল্মীকি রামায়ণ কাহিনী রচনা করেন। কথিত আছে যে, মহর্ষি বাল্মীকি রামের জন্মের ষাটহাজার বৎসর পূর্বে রামায়ণ রচনা করেন। রামায়ণে প্রথমে ছয়টি কাণ্ডে চব্বিশ হাজার শ্লোক ছিল। পরবর্তিতে বাল্মীকি উত্তর-কাণ্ড রচনা করার কারণে রামায়ণে কাণ্ড সংখ্যা হয় সাতটি, যথা আদি, অযোধ্যা, অরণ্য, কিষ্কিন্ধ্যা, সুন্দর, লঙ্কা ও উত্তর কাণ্ড। রামায়ণে রামের প্রিতৃভক্তি, ভ্রাতৃপ্রেম এবং সত্যপরায়ণতা আজও সকলের শিক্ষণীয় ও অনুসরণীয়। দেবী সীতা তাঁর সতীত্ব ও পতিভক্তির জন্য সকল হিন্দুনারীর নিকট আদর্শনীয়া ও পাতঃস্মরণীয়া হয়ে আছেন। দর্শন বিচারে রাম শুভ বিবেক আর রাবণ ভোগের প্রতীক। রাবণের দশ মাথা দশ ইন্দ্রিয়কে সূচিত করে। ঐ দশ ইন্দ্রিয় শুধু বিষয়-ভোগে নিয়োজিত থাকে। বিষয়-ভোগে উন্মত্ত ইন্দ্রিয় রূপ রাবণ যখন আনন্দময়ী শক্তি রূপ সীতাকে হরণ করে তখন বিবেক রূপ রাম রাবণকে বধ করে আনন্দময়ী সীতাকে উদ্ধার করেন। সুতরাং জ্ঞান বা বিবেকের দ্বারা ইন্দ্রয়কে দমন করলে দেহে আনন্দময়ী সত্তা জাগ্রত হয় এটাই রামায়ণের মূল-বস্তু। রামায়ণে রাম ১৫ বছর বয়সে মিথিলার রাজা জনকের কন্যা সীতা দেবীকে বিবাহ করেন। ১২ বছর অযোধ্যায় বসবাসের পর ২৭ বৎসর বয়সের সময় রাম পিতৃসত্য পালনের জন্য অষ্টাদশবর্ষীয়া সীতা ও লক্ষ্মণকে নিয়ে ১৪ বৎসরের জন্য বনবাসে যান। বনবাসের ১৩ বছর শেষে মাঘ মাসের কৃষ্ণ অষ্টমী তিথিতে রাবণ সীতাকে হরণ করে। পরের বছর মাঘ মাসের দ্বিতীয়াতে রাম ও রাবণের যুদ্ধ আরম্ভ হয়। ৮৭ দিন পর কৃষ্ণ চতুর্দশী তিথিতে রাবণকে বধ করে রাম সীতা দেবীকে উদ্ধার করেন। এখন রামায়ণের সংক্ষিপ্ত কাহিনী আলোচনা করা যাক।

রামায়ণ

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-১। সূচনা।

    ত্রেতাযুগে অযোধ্যায় দশরথ নামে এক বেদজ্ঞ, দূরদর্শী, সত্যবাদী ও প্রজাপ্রিয় রাজা ছিলেন। কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রা নামে রাজা দশরথের তিন রাণী ছিল। অনেক দিন অতিবাহিত হওয়ার পরেও তাঁর কোন সন্তান না হওয়ায় তিনি সন্তান কামনায় অশ্বমেদ যজ্ঞের আয়োজন করেন। ঋষ্যশৃঙ্গ নামক এক মুনি যজ্ঞের পৌরহিত্য করেন। এই সময়ে দেবতারা রাবণ নামক এক পুলস্ত্য-বংশীয় রাক্ষসের অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে ব্রহ্মার শরণাগত হন। রাবণ ব্রহ্মার নিকট বর পেয়েছিলেন যে, কোন দেবতা, গন্ধর্ব, যক্ষ ও রাক্ষসের হাতে তার মুত্যু নেই কিন্তু মানুষ তাঁকে বধ করতে পারবে। তাই ব্রহ্মার অনুরোধে দেবতারা বিষ্ণুর নিকট প্রার্থনা করেন যে, তিনি যেন মনুষ্য রূপে পৃথিবীতে অবর্তীণ হয়ে রাবণকে বধ করেন। দেবতাদের প্রার্থনায় তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু দশরথের তিন রাণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করতে সম্মত হন। যা হোক, যজ্ঞের সময় দশরথের ঐ যজ্ঞের অগ্নি থেকে পায়সে পরিপূর্ণ পাত্র হস্তে এক প্রজাপতি প্রেরিত পুরুষ উঠে আসলেন এবং দশরথকে বললেন, “মহারাজ, এই দেবনির্মিত সন্তানদায়ক পায়স আপনার পত্নীদের খেতে দিন”। তারপর দশরথ ঐ পায়সের অর্ধাংশ কৌশল্যাকে, অবশিষ্ট অর্ধেকের অধাংশ সুমিত্রাকে এবং অবশিষ্ট অর্ধেকের অর্ধাংশ সুমিত্রাকে খেতে দিলেন অর্থাৎ ১৬ ভাগের ৮ ভাগ কৌশল্যাকে, ৪ ভাগ কৈকেয়ীকে এবং ২ ভাগ সুমিত্রাকে খেতে দিলেন। যজ্ঞের দ্বাদশ মাস পরে চৈত্র মাসের নবমী তিথিতে পুনর্বসু নক্ষত্রে বড় রাণী কৌশল্যার গর্ভে রামের, পুষ্যা নক্ষত্রে মেঝ রাণী কৈকেয়ীর গর্ভে ভরতের এবং অশ্লেষা নক্ষত্রে ছোট রাণী সুমিত্রার গর্ভে লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নের জন্ম হয়। জন্মের সময় আকাশ থেকে দেবগণ পুষ্প বৃষ্টি করলেন। জন্মের এগার দিন পর কুলপুরোহিত বশিষ্ঠ দশরথের চার পুত্রের  নামকরণ করেন। বাল্যকাল থেকে রাম ও লক্ষ্মণের মধ্যে এবং ভরত ও শত্রুঘ্নের মধ্যে প্রগাঢ় স্নেহ-সম্বন্ধ ছিল। রাজা দশরথ চারপুত্রের মধ্যে রামকে অত্যাধিক স্নেহ করতেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-২। তাড়কা ও বিভিন্ন রাক্ষস বধ।

    পুত্রদের বয়স ষোল বৎসরও হয়নি, এমন সময় বিশ্বামিত্র মুনি দশরথের নিকট উপস্থিত হলেন। মহামুনি জানালেন যে, তিনি এক যজ্ঞ আরম্ভ করেছেন কিন্তু মারীচ ও সুবাহু নামক দুই মহাবলী রাক্ষস যজ্ঞবেদির উপর মাংস ও রক্ত বর্ষণ করছে। এরকম বিঘ্ন করার পরও তিনি রাক্ষসদ্বয়কে বিনাশ করতে পারছেন না, কারণ যজ্ঞকালে শাপ দেয়া অনুচিত বলে তিনি ক্রোধ সংবরণ করেছেন। তাই তিনি ঐ রাক্ষসদ্বয়কে বধ করার জন্য জ্যেষ্ঠপুত্র রামকে দশ রাত্রির জন্য নিয়ে যেতে চান। রাম দশরথের প্রাণাধিক প্রিয়। তাই তিনি প্রথমে রামকে বিশ্বামিত্রের সাথে যেতে দিতে চাননি কিন্তু তাতে বিশ্বামিত্র ক্রোধান্বিত হন। অগত্যা দশরথ রামকে যেতে দিতে সম্মত হন। তারপর বিশ্বামিত্র মুনি রাম ও লক্ষ্মণকে নিয়ে অযোধ্যা ত্যাগ করেন।

   মলদ ও করুষ নামক স্থানে তাড়কা নামক এক যক্ষীর দৌরাত্ম্য ছিল। তাড়কা সুকেতু নামক এক যক্ষের কন্যা এবং জম্ভপুত্র সুন্দের পত্নী। তাড়কা ও তার পুত্র মারীচ অগস্ত্য মুনিকে ভক্ষণ করতে গেলে মুনির শাপে তাড়কা ও মারীচ রাক্ষসে পরিণত হয়। বিশ্বামিত্রের নির্দেশে রাম রাক্ষসী তাড়কাকে তীরবিদ্ধ করে বধ করেন। তারপর বিশ্বামিত্র মুনি ধ্যানযোগে প্রাপ্ত দণ্ডচক্র, বিষ্ণুচক্র, বজ্র, শৈবশূল, বারুণ পাশ, বায়ব্যাস্ত্র, বষর্ণাস্ত্র, শোষণাস্ত্র প্রভৃতি দিব্যাস্ত্র রামকে দান করেন। ষষ্ঠ দিনে বিশ্বমিত্র যজ্ঞবেদি প্রজ্জ্ব¡লিত করেন। তখন মারীচ ও সুবাহু যজ্ঞে বিঘ্ন সৃষ্টি করলে রাম শরাসনে মানবাস্ত্র যোজনা করে মারীচকে, আগ্নেয়াস্ত্রে সুবাহুকে এবং বায়ব্যাস্ত্রে অন্যান্য রাক্ষসদের বধ করেন। পরের দিন প্রভাতে বিশ্বামিত্র রাম ও লক্ষ্মণকে নিয়ে মিথিলা রাজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-৩। রাম ও সীতার বিবাহ।

    মিথিলা যাওয়ার পথে গৌতম মুনির আশমে রামের পাদস্পর্শে পাষাণরূপিণী অহল্যা শাপমুক্ত হয়ে মানবী রূপ ধারণ করেন। এই অহল্যা ছিলেন গৌতম মুনির পত্নী। গৌতমের অনুপস্থিতিতে ইন্দ্র গৌতমের ছদ্মবেশে অহল্যার নিকট এসে তাঁর সতীত্ব হরণ করেছিলেন। গৌতম ফিরে এসে এ ঘটনা বুঝতে পেরে ইন্দ্র ও অহল্যাকে শাপ দিয়েছিলেন। গৌতমের ঐ শাপে ইন্দ্র নপুংসক এবং অহল্যা পাষাণে পরিণত হয়েছিলেন। তবে গৌতম পরে একথাও বলেছিলেন যে, দশরথপুত্র রাম যেদিন এ আশ্রমে আসবেন সেদিন অহল্যার শাপ-মোচন হবে এবং তাঁকে লাভ করবে। গৌতমের ঐ বাক্য অনুসারে রামের স্পর্শে অহল্যা শাপমুক্ত হয়ে গৌতমের কাছে চলে গেলেন এবং বিশ্বামিত্র ও রাম-লক্ষ্মণ মিথিলার জনকের কন্যা সীতার সয়ংবর সভার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।

    জনক সম্পর্কে কিছু কথা বলা বিশেষ প্রয়োজন। জনক কিন্তু কোন ব্যক্তি বিশেষের নাম নয়। জনক মূলত মিথিলার রাজাদের উপাধি। সীতার পিতার প্রকৃত নাম সীরধ্বজ। এবার জনকের বংশ পরিচয় সম্পর্কে আসা যাক। ধর্মাত্মা নিমির পুত্রের নাম মিথি এবং মিথির পুত্রের নাম জনক। তিনিই মিথিলার প্রথম জনক (রাজা)। তাঁর তিন পুরুষ পরে দেবরাত এবং দেবরাতের চৌদ্দপুরুষ পরে  হ্রস্বরোম। হ্রস্বরোমের দুই পুত্র, জ্যেষ্ঠ সীরধ্বজ (জনক) এবং কনিষ্ঠ কুশধ্বজ। যা হোক, সীতা কিন্তু জনকের ঔরসজাত নয় অর্থাৎ সীতা অযোনিজা (যোনিভেদ করে যার জন্ম নয়)। ধর্মাত্মা ও বৈদেহী জনক জমি চাষ করার সময় হলরেখা থেকে এক কন্যা উঠে এসেছিল। জনক সে কন্যাকে নিজ কন্যার মত লালন-পালন করেছিলেন। লাঙ্গল দ্বারা জমি চাষের ফলে জমিতে যে হলরেখা সৃষ্টি হয় তাকে সীতা বলে। সীতা (হলরেখা) থেকে ঐ কন্যাকে পেয়েছেন বলে ঐ কন্যার নাম রেখেছেন সীতা। জনক ঠিক করলেন যে, এই অযোনিজা কন্যা বীর্যশুল্কা (বীরত্ব প্রকাশ রূপ পণ দিয়ে নিতে হয় এমন নারী) হবেন। সে জন্য তিনি স্থির করলেন যে, যিনি তাঁর নিকট রক্ষিত মহাদেবের ধনু ভঙ্গ করতে পারবেন, তিনিই সীতাকে বিবাহ করার যোগ্য হবেন। কত রাজা-মহারাজা যক্ষ-রক্ষ, দেবতা, অসুর সে হরধনু ভঙ্গের চেষ্টা করেছিল কিন্তু কেউ ঐ হরধনু ভঙ্গ করতে পারল না। তখন বিশ্বমিত্রের নির্দেশে রাম সেই ধনুক অবলীলায় তুলে নিয়ে ভঙ্গ করলেন। সে সময় বজ্রপাৎতুল্য শব্দে স্বর্গ-মর্ত্য কম্পিত হল। জনক তাঁর কন্যা সীতাকে রামের মত বীরের হস্তে সমর্পণ করতে পারবে ভেবে আনন্দিত হলেন। পরের দিন রাজা দশরথ জনকের দূতগণের নিকট এই খবর পেয়ে মিথিলায় উপস্থিত হলেন। দশরথের সাথে তাঁর মন্ত্রীবর্গ, বশিষ্ট প্রভৃতি ঋষিগণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন মিথিলায় আসলেন।

    বশিষ্ট মুনির ইচ্ছায় জনক জ্যেষ্ঠা কন্যা সীতাকে রামের হস্তে এবং কনিষ্ঠা কন্যা ঊর্মিলাকে লক্ষ্মণের হস্তে সমর্পণ করতে সম্মত হলেন। পরে বিশ্বামিত্র মুনির ইচ্ছায় জনক তাঁর ভ্রাতা কুশধ্বজের কন্যা মাণ্ডবীকে ভরতের সাথে এবং শ্রুতকীর্তিকে শত্রুঘ্নের সাথে বিবাহ দিতে সম্মত হলেন। মহা-আড়ম্বরে চার ভ্রাতার বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর দশরথ তাঁর পুত্র ও পুত্রবধুগণ সহ আযোধ্যার দিকে যাত্রা করলেন। পথে হঠাৎ পরশুরাম সবার সম্মুখে এসে উপস্থিত হলেন। পরশুরাম রামকে বললেন, “আমি তোমার বীরত্ব আর হরধনু ভঙ্গের কথা শুনেছি। আমি আর এক ধনু এনেছি, তুমি এতে শর যোজনা করে নিজের বল দেখাও”। রাম পরশুরামের নির্দেশমত ধনুতে শর যোজনা করলেন। তখন পরশুরামের দেহ থেকে তেজোরশ্মি রামের দেহে প্রবেশ করল। পরশুরাম বুঝতে পারলেন যে, এই দশরথপুত্র রামই বিষ্ণুর অবতার এবং পরে তিনি রামকে প্রদক্ষিণ করে মহেন্দ্র পর্বতে তপস্যায় চলে গেলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-৪। রামের বনে গমন।

    বিবাহের পর সকলে অযোধ্যায় ফিরে এলে রাজমাতাগণ পুত্র ও পুত্রবধুদের বরণ করে নিলেন। কয়েকদিন পর ভরত ও শত্রুঘ্ন মামা বাড়ি গেলেন এবং রাম ও লক্ষ্মণ পত্নীসহ সুখে বাস করতে লাগলেন। রাজা দশরথ রামকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং সে উপলক্ষে অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। তখন কৈকেয়ীর পিত্রালয় থেকে আগত মন্থরা নামক এক কুব্জা দাসী কৈকেয়ীকে মন্ত্রণা দিলেন যে, দশরথ রামকে অভিষিক্ত করলে কৈকেয়ীর গর্ভজাত ভরত কখনই রাজা হতে পারবে না বরং সে রামের দাস হয়ে থাকবে। মন্থরার এই রকম কুবুদ্ধিতে বশিভূত হয়ে কৈকেয়ী রাজা দশরথের নিকট দুইটি বর চাইলেন। রামের পরিবর্তে ভরতের অভিষেক হোক এটা ছিল তাঁর প্রথম বর এবং রাম মৃগচর্ম পরিধান করে তপস্বী হয়ে চৌদ্দ বৎসর দণ্ডকারণ্যে বাস করুক এটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় বর। এই বর প্রার্থনার একটা ইতিহাস আছে। একবার দেবাসুরের যুদ্ধে কৈকেয়ী তাঁর রণ-কৌশল আর বুদ্ধিমত্তার দ্বারা দশরথের প্রাণরক্ষা করেছিলেন। দশরথ তখন খুশি হয়ে কৈকেয়ীকে দুটি বর দিতে চেয়েছিলেন। কৈকেয়ী সে বর তখন চাননি। তাই এখন স্বার্থসিদ্ধির জন্য সে ঐ বর চাইলেন। রাজা দশরথ কৈকেয়ীর ঐ কথা শুনে মুছির্ত হলেন। জ্ঞান ফিরে আসার পর তিনি কৈকেয়ীকে শত বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। অবশেষে তিনি কৈকেয়ীর শর্ত মেনে নিয়ে রামকে কাছে ডাকলেন। কৈকেয়ী তাঁর বরের কথা রামকে খুলে বললে রাম অকপটে সব শর্ত মেনে নিলেন এবং শীঘ্রই বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন।

    রামের বনে যাওয়ার কথা শুনে দশরথ মুর্ছিত হয়ে পড়লেন। রামের মুখে সবকথা শুনে লক্ষ্মণ ক্রোধান্বিত হন এবং রামকে জোড়পূর্বক রাজ্য অধিকার করতে বলেন। কিন্তু পিতৃভক্ত রাম পিতা দশরথের আদেশ অমান্য করে রাজ্য অধিকার করে সুখভোগ করার চেয়ে বনে গমন শ্রেয় মনে করলেন। রাম সীতাকে মাতা কৌশল্যা ও পিতা দশরথের সেবার জন্য রেখে বনে যেতে চাইলেন। কিন্তু পতিব্রতা সীতা পতি রামকে ছেড়ে থাকতে অসম্মত হলেন এবং তিনিও রামের সাথে বনে গমন করতে চাইলেন। রাম তাঁকে বোঝালেন যে, বনে বাস করা অনেক বিপদজনক এবং তাঁর মত কোমলমতী নারীর পক্ষে তা অসম্ভব। কিন্তু পতিব্রতা সীতার নিকট পতিকে ছাড়া সংসারে সুখভোগের চেয়ে পতির সাথে বনে গিয়ে দুঃখেভোগই শ্রেয়। তাই সীতার সঙ্কল্পের কাছে নত হয়ে রাম সীতাকে বনে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। শুধু সীতা নয় লক্ষ্মণও রামের সাথে বনে যাওয়ার সঙ্কল্প করলেন।

    বনে যাওয়ার পূর্বে রাম পিতা দশরথের কক্ষে গেলেন। দশরথ রামকে বনে যেতে নিষেধ করেন এবং তাঁকে বন্দি করে রাজ্য অধিকার করার কথা বলেন। জোরপূর্বক রাজ্য অধিকার করা ক্ষাত্রধর্মের বিরোধী নয়। কিন্তু রাম যদি জোরপূর্বক রাজ্য অধিকার করেন, তবে কৈকেয়ীকে দেয়া দশরথের বর নিষ্ফল হবে। বর নিষ্ফল হলে দশরথের মান ও ধর্ম দুটোই নষ্ট হবে। তাই রাম পিতা দশরথের মঙ্গলের কথা ভেবে বনে গমনের সিদ্ধান্ত নিলেন। বনে গমনের পূর্বে রাম ব্রাহ্মণগণকে এবং মন্ত্রী চিত্ররথকে ধেনু, ধন-রত্ন, বস্ত্র, যান ও দাসী দান করলেন। রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ, পিতা, মাতা ও বিমাতাদের প্রণাম করে রথে আরোহনপূর্বক বনের উদ্দেশ্যে রওনা করলেন। সুমন্ত হলেন তাঁদের রথের সারথী। বহু অযোধ্যাবাসীরা তাঁর রথের পিছনে পিছনে তমসা নদীর তীর পর্যন্ত গেলেন। সেখানে সবাই একরাত্র কাটানোর পর রাম সকলের নিদ্রাভঙ্গের পূর্বেই সে স্থান হতে বনের দিকে দ্রুত গমন করলেন। অযোধ্যাবাসীগণ নিদ্রাভঙ্গের পর রামকে না দেখতে পেয়ে বিলাপ করতে করতে অযোধ্যায় ফিরে এলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-৫। রাম ও সীতার বনবাস।

    রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ রথে আরোহন করে গঙ্গার তীরবর্তী প্রদেশে এসে নিষাদ রাজার আতিথ্য গ্রহণ করলেন। পর দিন তাঁরা গঙ্গা পার হয়ে বৎসদেশে আশ্রয় নিলেন এবং সুমন্ত শোকাতুর চিত্তে অযোধ্যায় ফিরে এলেন। বৎসদেশে রাত্রিযাপন শেষে তাঁরা গঙ্গা ও যমুনার সংযোগ স্থলে ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে গেলেন। পরদিন তাঁরা মুনির কথামত দশ ক্রোশ দূরে অবস্থিত বহু মুনি-ঋষির তপস্যা স্থল চিত্রকূট পবর্তের নিকট গমন করলেন। চিত্রকূট পর্বতের পাদদেশে যে বন আছে, ঐ বনে বাল্মীকি মুনির আশ্রম রয়েছে। রাম-সীতা ও লক্ষ্মণ ঐ আশ্রমের নিকট গৃহ নির্মাণ করে বাস করতে লাগলেন।

    সুমন্তের মুখে রামের বনগমনের কথা শুনে দশরথ আরও শোকাতুর হয়ে পড়লেন। রামের বনযাত্রার ষষ্ঠ রাত্রির মধ্যভাগে দশরথের একটি পূর্বস্মৃতি জেগে উঠল। তিনি কৌশল্যাকে অতীতের এক দুষ্কৃতির কথা শোনালেন। তিনি বিবাহের পূর্বে যুবরাজ থাকাকালে বর্ষার সময় সরযু নদীর তীরে মৃগয়ায় গিয়েছিলেন। অন্ধকারে যখন সরযুর জল অদৃশ্য হয়ে গেল তখন কলসে জল ভরার শব্দ শুনে দশরথ মন করলেন কোন হস্তী হয়তো জলপান করছে। তিনি ঐ শব্দ লক্ষ্য করে শব্দভেদী শর নিক্ষেপ করলেন। কিছুক্ষণ পর এক মানুষের আর্তনাদ ও ক্রদন শোনা গেল। দশরথ নিকটে গিয়ে দেখেন তিনি যাকে বধ করেছেন, তা কোন হস্তী নয়, এক মুনিকুমার। মুনিকুমার অন্ধ পিতামাতার জন্য জল নিতে এসেছিলেন। দশরথ মুনিকুমারের অনুরোধে তাঁর পিতা অন্ধুমনির নিকট গিয়ে সব খুলে বললেন। অন্ধমুনি ও তাঁর পত্নী পুত্রের মৃত্যুর কথা শুনে শোকে কাতর হলেন এবং কুপিত হয়ে দশরথকে অভিশাপ দিলেন যে, তাঁকেও একদিন পুত্রশোকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। দশরথ এই ইতিহাস শেষ করে নিজের কৃতকর্মে ভাবতে ভাবতে আর রামের শোকে বিলাপ করতে করতে অর্ধরাত্রের পর প্রাণত্যাগ করলেন। ভরত ঐ রাতে এক দুঃস্বপ্ন দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে মাতুল বাড়ি থেকে শত্রুঘ্নকে নিয়ে অযোধ্যার উদ্দেশ্যে রওনা হন। অযোধ্যায় এসে তিনি রামচন্দ্রের বনগমন ও পিতার মৃত্যুর কথা শুনতে পান। ভরত ও শত্রুঘ্ন পিতার মৃত্যুশোকে কাতর হলেন এবং মন্থরা ও কৈকেয়ীকে তাদের পাপকর্মের জন্য তিরস্কার করেন।

    ভরত অযোধ্যার সিংহাসন প্রত্যাখ্যান করে জ্যেষ্ঠ রামকে ফিরিয়ে আনার জন্য মাতাগণকে সঙ্গে নিয়ে বনের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। ভরত রামের নিকট উপস্থিত হয়ে পিতার মৃত্যু সংবাদ শোনালেন। ঐ দুঃসংবাদ শুনে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ শোকে ক্রন্দন করতে থাকলেন। ভরত রামকে অযোধ্যায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে অযোধ্যার রাজা করতে চাইলেন এবং নিজে চৌদ্দ বৎসর বনে বাস করতে চাইলেন। কিন্তু রাম পিতৃসত্য পালনে দৃঢ়-প্রতীজ্ঞ। তাই তিনি ভরতের প্রস্তাবে সম্মত না হয়ে তাঁকে অযোধ্যায় ফিরে গিয়ে রাজ্য পরিচালনা করার নির্দেশ দেন। অগত্যা ভরত জ্যেষ্ঠ রামের নির্দেশ পালন করার জন্য অযোধ্যায় ফিরে আসেন। পরের দিন রাম চিত্রকূট ত্যাগ করে অত্রি মুনির আশ্রমে গেলেন। অত্রির পত্নী অনসূয়া সীতার আচারনিষ্ঠা ও পতিভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে বস্ত্র অলঙ্কার, গন্ধ, অনুলেপন প্রভৃতি উপহার দিলেন। অত্রি মুনির আশ্রমে এক রাত্র যাপন করে তাঁরা দণ্ডকারণ্যে গেলেন। সেখানে বিরাধ নামক এক রাক্ষস রাম-লক্ষ্মণকে বধ করে সীতাকে পত্নী রূপে গ্রহণ করতে চাইল। তখন রাম-লক্ষ্মণ বিরাধকে বধ করেন। অন্তিমকালে বিরাধ তাঁদের জানাল যে, সে পূর্বে তুম্বুরু নামক এক গন্ধর্ব ছিল। কুবেরের শাপে তাকে রাক্ষস হতে হয়েছে এবং রামের পদস্পর্শে তার শাপমোচন হয়েছে। পরে রাম-লক্ষ্মণ ও সীতা বিরাধের অনুরোধে শরভঙ্গ ঋষির আশ্রমে গেলেন। শরভঙ্গ তপোবলে ব্রহ্মলোকে গমনের অধিকার করেছেন। ইন্দ্র তাঁকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসলেন। কিন্তু শরভঙ্গ রামের আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। রাম এলে রামের সাথে সাক্ষাৎ করার পর তিনি দেহ ত্যাগ করে ব্রহ্মলোক গমন করেন। শরভঙ্গ দেহত্যাগ করার পূর্বে রাম তাঁর নিকট বসবাসের উপযোগী স্থানের কথা জেনে নিলেন। তারপর শরভঙ্গের কথামত তাঁরা মন্দাকিনী নদীর স্রোতের বিপরীত দিকে সুতীক্ষ্ণের ঋষির আশ্রমে গেলেন। রাম-লক্ষ্মণ ও সীতা সুতীক্ষ্ণের আশ্রমে এক রাত্র যাপন করার পর বিভিন্ন মুনি-ঋষিদের আশ্রম ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

    রাম-লক্ষ্মণ ও সীতা ভ্রমণকালে সবার আগে থাকতেন রাম মধ্যে সীতা এবং সবার পিছনে থাকতেন লক্ষ্মণ। রাম-সীতা-লক্ষ্মণ নানা আশ্রমে ভ্রমণ করতে করতে যখন দশ বছর অতিবাহিত হয়ে গেল, তখন তাঁরা পুনরায় সুতীক্ষ্ণের আশ্রমে ফিরে এলেন। রাম-সীতা-লক্ষ্মণ সুতীক্ষ্ণের মুনির নিকট অগস্ত্যের মহীমার কথা শুনলেন। বিন্ধ্য নামক পর্বত সুর্যের গতিপথ রোধ করার জন্য বর্ধিত হচ্ছিল। ফলে প্রজারা সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। তখন অগস্ত্য প্রজাদের মঙ্গলের জন্য বিন্ধ্যপর্বত ডিঙ্গিয়ে চলে পাওয়ায় সময় পর্বতকে নির্দেশ দিলেন যে, তিনি যতক্ষণ না ফিরে আসবেন ততক্ষণ যেন সে বর্ধিত না হয়। অগস্ত্য ঐ স্থানে আর ফিরে আসেনি, তাই অগস্তের অনুগত বিন্ধ্যপর্বতও আর বর্ধিত হতে পারেনি। এছাড়াও অগস্ত্য ইল্বল ও বাতাপি নামক দুই অসুরকে বধ করেছিলেন। অগস্ত্যের কথা শোনার পর রাম-সীতা-লক্ষ্মণ সুতীক্ষ্ণের নিকট হতে অগস্ত্য মুনির আশ্রমে রওনা হলেন। অগস্ত্য মুনির সাথে সাক্ষাৎ শেষে রাম-লক্ষ্মণ-সীতা তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী পঞ্চবটী নামক বনের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পঞ্চবটীতে প্রবেশকালে তাঁরা জটায়ু নামক বিরাটাকার পক্ষীর দর্শন পেলেন। জটায়ুর বংশপরিচয় এরকম কশ্যপের ঔরসে দক্ষ কন্যা দনুর গর্ভে শুকীর জন্ম। শুকীর গর্ভে নতা এবং নতার গর্ভে বিনতার জন্ম। বিনতার গর্ভে গরুড় ও অরুণ জন্মগ্রহণ করেন। অরুণের জ্যেষ্ঠপুত্র সম্পাতি এবং কনিষ্ঠ পুত্র জটায়ু। জটায়ু রাম-লক্ষ্মণ ও সীতাকে দেখে তাঁদের ভক্ত হয়ে গেলেন এবং তিনি বনে সীতাকে রক্ষার ভার নিলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-৬। পঞ্চবটী বণে শূর্পণখার নাক কর্তণ।

    পঞ্চবটীতে লক্ষ্মণ মাটি, বাঁশ, শমীবৃক্ষের শাখা, কুশ-কাশপত্র প্রভৃতি দিয়ে এক পর্ণকুটির নির্মাণ করেন এবং তাঁরা সেখানে সুখে বাস করতে থাকেন। একদিন রাক্ষস রাবণের বোন শূর্পণখা তাঁদের কুটিরের নিকট এসে রামের রূপ দর্শনে মোহিত হলেন এবং রামকে পতিরূপে গ্রহণ করার প্রস্তাব দিলেন। রাম সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে শূর্পণখা লক্ষ্মণকে পতি রূপে গ্রহণ করতে চাইল। লক্ষ্মণও তাকে ফিরিয়ে দিলে সে সীতাকে ভক্ষণ করতে এগিয়ে যায়। লক্ষ্মণ তখন রামের নির্দেশে খড়গাঘাতে ঐ রাক্ষসীর নাক ও কান কেটে দিলেন। শূর্পণখা তার মাসতুত ভাই খর ও দূষণের নিকট গিয়ে রাম-লক্ষ্মণ কতৃর্ক তার অপমানিত হওয়ার কথা খুলে বলল। খর ও দূষণ বোনের অপমানের প্রতিশোধ নিতে আসলে তারা রাম-লক্ষ্মণ কতৃর্ক নিহত হয়। ঐ যুদ্ধে খর-দূষণের চৌদ্দ হাজার রাক্ষস সৈন্যও নিহত হয়। অকম্পন ও শূর্পণখা রাবণের নিকট রাক্ষস নিধনের সব ঘটনা খুলে বলে। রাবণ সব শুনে ক্রোধিত হয় রাম-লক্ষ্মণকে বধের প্রতীজ্ঞা করল। তখন অকম্পন জানাল যে, যুদ্ধ করে রাম-লক্ষ্মণকে পরাজিত করা যাবে না। রামের প্রাণাধিক প্রিয় ভার্যা সীতাকে হরণ করতে পারলে রাম-লক্ষ্মণ তাঁর দুঃখে দুর্বল হয়ে পড়বে আর তখন তাঁদের বধ করা সহজ হবে।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-৭। রাবন কর্তৃক সীতা হরণ।

    রাবণ অকম্পনের পরামর্শমত রথে চেপে প্রথমে মারীচের আশ্রমে গিয়ে তাকে সব ঘটনা বলল। মারীচও রাম-লক্ষ্মণকে বধে ও সীতাকে হরণকার্যে রাবণকে সহয়তা করতে সম্মত হল। মায়াবী মারীচ একটি সোনার হরিণের রূপ ধরে পঞ্চবটী বনে গল। সীতা ঐ মায়ামৃগকে দেখে মোহিত হলেন এবং রামকে অনুরোধ করলেন ঐ সোনার হরিণ ধরে তাঁর কাছে নিয়ে আসার জন্য। রাম-লক্ষ্মণ সীতাকে বোঝালেন যে, ঐ হরিণ কোন রাক্ষসের মায়া হতে পারে এবং ঐ হরিণকে ধরতে গেলে কোন বিপদে পড়তে হতে পারে। কিন্তু সিতার সঙ্কল্পের নিকট হার মেনে রাম ঐ সোনার হরিণ ধরতে উদ্যত হলেন। রাম যতই হরিণের নিকটে যান, হরিণ ততই দূরে পালিয়ে যায়। এভাবে রাম হরিণের পিছে পিছে বহুদূর যাওয়ার পর এক বাণ নিক্ষেপ করেন। সেই বাণে ঐ হরিণ বিদ্ধ হয় এবং হরিণরূপী মারীচ নিজ রূপ ধারণ করে। মৃত্যুর পূর্বে মারীচ রামের কণ্ঠস্বর অনুকরণ করে “হা সীতা, হা লক্ষ্মণ” বলে চিৎকার করতে করতে মারা গেল। সীতা ঐ চিৎকার শুনে বুঝতে পারলেন যে, রাম হয়তো বড় বিপদে আছেন। তাই তিনি লক্ষ্মণকে নির্দেশ দেন রামকে সাহায্য করার জন্য। রাম অনুজ লক্ষ্মণকে সীতার সুরক্ষার জন্য রেখে গেছেন তাই তিনি রামের আদেশ উপেক্ষা করে সীতার কথায় যেতে সম্মত হলেন না। কিন্তু সীতার ভর্ৎসনায় লক্ষ্মণ যেতে বাধ্য হলেন। এই সুযোগে রাবণ পরিব্রাজক তপস্বীর রূপ ধরে সীতার নিকট এল। সীতা রাবণকে ব্রাহ্মণ মনে করে আসন, পাদ্য ও ভোজ্য দিয়ে সংবর্ধনা দিলেন। তারপর সীতার রূপে মুগ্ধ হয়ে রাবণ নিজ পরিচয় দিল এবং সীতাকে পত্নী রূপে কামনা করল। সীতা তখন রাবণকে দৃঢ়ভাবে ভর্ৎসনা করলে রাবণ নিজ রূপ ধারণ করে সীতাকে জোরপূর্বক রথে তুলে নিজ রাজ্য লঙ্কার অভিমুখে রওনা হল।

   সীতাকে রাবণ নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি এক বৃক্ষের উপর জটায়ুকে দেখে তাঁর শরণাপন্ন হন। জটায়ু সীতাকে রক্ষা করার জন্য রাবণের সাথে যুদ্ধ করতে উদ্যত হলেন। দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধের পর রাবণ খড়গাঘাতে জটায়ুর পাখা, পা ও পার্শ্বদেশ ছিন্ন করলে জটায়ু ভূপাতিত হন। তখন সীতা নিরূপায় হয়ে তাঁর দেহের সব অলঙ্কার নিচে ফেলতে লাগলেন যাতে ঐ অলঙ্কার দেখে রাম-লক্ষ্মণ বুঝতে পারেন যে, তাঁকে কোন পথে হরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জনশূন্য অরণ্য প্রদেশের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে সীতা একটি পর্বতশৃঙ্গে পাঁচটি বানর দেখলেন এবং রামকে সংবাদ দেবে এই আশায় তিনি তাঁর উত্তরীয় ও কিছু অলঙ্কার ফেলে দিলেন। তারপর সীতাকে রাবণ তার লঙ্কাপুরীর নিকট অশোক বনে নিয়ে যায় এবং কিছু রাক্ষসী নিযুক্ত করে সীতাকে সেবা করার ও বশে আনার জন্য।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-৮। সীতা অন্বেষণ।

    রাম-লক্ষ্মণ ফিরে এসে কুটিরে সীতাকে দেখতে না পেয়ে বুঝতে পারেন যে, কোন রাক্ষস হয়তো সীতাকে হরণ করেছে। তাঁরা সীতাকে খুজতে খুজতে এক স্থানে সীতার অলঙ্কার ও রাক্ষসের পদচিহ্ন দেখতে পান। কিছুদুর যেতে যেতে তাঁরা জটায়ুকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। রাম-লক্ষ্মণ জটায়ুর মুখে শুনতে পান যে, বিশ্রবার পুত্র রাবণ সীতাকে হরণ করে দক্ষিণ দিকে নিয়ে গেছে এবং তাঁর পাখা ও চরণ কেটে দেয়েছে। রাবণ সম্পর্কে বিস্তারিত বলার পূর্বেই জটায়ুর মৃত্যু হয়। রাম-লক্ষণ জটায়ুর শেষকৃত্য সম্পন্ন করে দক্ষিণ দিকে যাত্রা করলেন। তাঁরা হাটতে হাটতে ক্রৌঞ্চ নামক অরণ্যে উপস্থিত হলেন। সেখানে অয়োমুখী নামক এক রাক্ষসী লক্ষ্মণকে পতি রূপে গ্রহণ করতে চাইলে লক্ষ্মণ কুপিত হয়ে তার নাক, কান ও স্তন কেটে দিলেন। বনের একটু গভীরে যেতেই কবন্ধ নামক এক বিরাটাকার রাক্ষস তাঁদের আক্রমন করল। রাম-লক্ষ্মণ কবন্ধের দুই বাহু কেটে দিলেন। তখন কবন্ধ জানাল যে, সে পূর্বে খুব রূপবান ছিল কিন্তু স্থুলশিরা ঋষির অভিশাপে কুৎসিত রাক্ষসে পরিণত হয়েছিল। রাম তাঁর বাহু ছেদন করায় তার শাপমুক্তি হল। রাম-লক্ষ্মণ কবন্ধের শেষকৃত্য করার পর সে পূর্বের রূপ ফিরে পেয়ে সে জানাল যে, সুগ্রীব নামক এক সত্যনিষ্ঠ, ধীর ও মহাবলশালী বানর সীতা অন্বেষণে সাহায্য করতে পারে। সুগ্রীব তাঁর ভ্রাতা ইদ্রপুত্র বালী কতৃর্ক বিতাড়িত হয়ে পম্পা সরবরের তীরবর্তী ঋষ্যমূক পর্বতে চার জন বানরের সঙ্গে বাস করছিলেন। কবন্ধের কথামত রাম-লক্ষ্মণ পম্পা সরোবরের নিকট গেলেন। পম্পার পশ্চিম তীরে মাতঙ্গ মুনির আশ্রম অবস্থিত। ঐ আশ্রমে কেবল শবরী নামক এক ধর্মশীলা সন্ন্যাসিনী থাকেন। রাম-লক্ষ্মণ সেখানে গেলে শবরী তাঁদের চরণ-বন্দনা করে ও পাদ্য-আচমনীয় দিয়ে সম্মান করলেন। শবরী জানালেন যে, তিনি ব্যতীত এই আশ্রমের সব ঋষিই স্বর্গে গমন করেছেন। এবং তিনি কেবল রামের দর্শনের অপেক্ষায় তখনও দেহত্যাগ করেননি। রাম-লক্ষ্মণকে পরম ভক্তিভরে সেবা-যত্ন করার পর শবরী অগ্নিতে দেহ আহুতি দিলেন এবং দিব্য রূপে স্বর্গলোকে গমন করলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-৮। সীতা অন্বেষণ। রাম-লক্ষ্মণের সাথে হনুমানের সাক্ষাৎ।

    রাম-লক্ষ্মণ ঋষ্যমূক পর্বতের নিকট আসলে সুগ্রীব তাঁদের দূর হতে দেখে ভয় পেয়ে সহচর বানরদের সাথে এক নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলেন। সুগ্রীব তাঁর সচীব হনুমানকে রাম-লক্ষ্মণের পরিচয় জানতে পাঠালেন। এখন হনুমান সম্পর্কে কিছু কথা বলা যাক। হনুমানের পিতার নাম কেশরী এবং মাতার নাম অঞ্জনা। পবনদেবের ঔরসজাত বলে হনুমানকে পবনপুত্রও বলা হয়। হনুমান বাল্যকালে সূর্যকে ফল মনে করে ধরার জন্য আকাশে তিনশত যোজন উঠেছিলেন, কিন্তু ইদ্র কুপিত হয়ে তাঁর উপর বজ্র নিক্ষেপ করলে তিনি পবর্তের চূড়ায় নিপাতিত হয়। পর্বতের চূড়ার উপরে নিপতিত হওয়া ফলে তাঁর বাম হনু (চোয়াল) ভগ্ন হয়ে যায় সেই থেকে তিনি হনুমান নামে খ্যাত হলেন। বজ্রাঘাতেও জীবিত আছে দেখে ইন্দ্র তুষ্ঠ হয়ে তাঁকে স্বেচ্ছামৃত্যুর বর দিলেন এবং ব্রহ্মা তাকে বর দিলেন যে, কোন অস্ত্র তাকে বধ করতে পারবে না। যা হোক, হনুমান এক সন্ন্যাসীর রূপ ধরে রাম-লক্ষ্মণের নিকট আসলেন। রাম-লক্ষ্মণের নিকট সীতা হরণের কাহিনী শুনে তিনি নিজ রূপ ধারণ করলেন এবং রাম-লক্ষ্মণকে পিঠে বহন করে সুগ্রীবের কাছে নিয়ে গেলেন। সুগ্রীব হনুমানের নিকট রাম-লক্ষ্মণের পরিচয় শুনে তাঁদের সাথে মৈত্রী স্থাপন করলেন। সুগ্রীব রাম-লক্ষ্মণকে জানাল যে, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বালী তাকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেছে এবং তাঁর পত্নী রুমাকে গ্রহণ করেছে। সুগ্রীব আরও জানল যে, রাবণ সীতাদেবীকে হরণ করে নিয়ে যাওয়া সময় সে তাঁকে দেখেছে। তিনি সীতার ফেলে দেওয়া উত্তরীয় ও অলঙ্কার এনে রামকে দেখালে রাম-সীতার দুঃখে বিলাপ করতে লাগলেন। তখন সুগ্রীব আশ্বাস দিলেন যে, তিনি সীতাকে খুজে তাঁর নিকট এনে দেবেন। রামও তাকে স্বান্তনা দিয়ে বললে যে, তিনি বালীকে বধ করে তার স্ত্রীকে উদ্ধার করে দেবেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-৯। বালী ও সু্গ্রীবের যুদ্ধ এবং বালী বধ।

    রাম সুগ্রীবের সাথে বালী বধের পরিকল্পনা করলেন। সিদ্ধান্ত হল যে, সুগ্রীব বালীকে যুদ্ধে আহবান করবেন এবং সুগ্রীব ও বালীর যুদ্ধের সময় রাম তীর নিক্ষেপ করে বালীকে বধ করবেন। পরদিন সকলে সুগ্রীব পরিকল্পনা অনুসারে বালীকে যুদ্ধে অহবান করলে বালী যুদ্ধ করতে এল। তারপর শুরু হল বালী ও সুগ্রীবের তুমুল মুষ্টি যুদ্ধ। কিন্তু জ্যেষ্ঠ বালী ও কনিষ্ঠ সুগ্রীবের চেহারা একই রকম ছিল, ফলে রাম বালী ও সুগ্রীবকে পৃথক করতে পারলেন না। সুগ্রীব বালীর সাথে যুদ্ধে পরাজিত ও আহত হয়ে পালিয়ে এলেন। পরের দিন সুগ্রীবকে সহজে চেনার জন্য ফুলের মালা পড়ানো হল। আবার সুগ্রীব বালীকে যুদ্ধে আহবান করলে বালী সুগ্রীবের সাথে যুদ্ধ শুরু হল। রাম এবার বালী ও সুগ্রীবকে পৃথক করতে পেরে বালীকে লক্ষ্য করে বাণ নিক্ষেপ করলে বালী বিদ্ধ হয়ে ভূপাতিত হল। বালীর মৃত্যুতে তার পত্নী শোকে কাতর হয়ে সহমরণে যেতে চাইলে রাম তাকে স্বান্তনা দিয়ে শান্ত করলেন। ভ্রাতার মৃত্যুর পর সুগ্রীবও শোকার্ত হলেন এবং সন্ন্যাসী হয়ে জীবনধারণ করতে চাইলেন। রাম সুগ্রীবকে শোক হতে নিবৃত্ত করে কিষ্কিন্ধ্যার রাজা পদে এবং বালীপুত্র অঙ্গদকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-১০। বাণর-সেনাদের সীতা অন্বেষণ।

   বর্ষা শেষে শরৎ ঋতু এলে সুগ্রীব সৈন্য সংগ্রহের জন্য হনুমানকে নির্দেশ দিলেন। লক্ষ্মণ ও হনুমান মিলে বানর, ভল্লুক ও গোলাঙ্গুল বীরগণকে রামের সম্মুখে উপস্থিত করলেন। তারপর সুগ্রীব সীতাদেবীকে অনুসন্ধানের জন্য পূর্ব দিকে পাঠালেন বিনত নামক যুথপতিকে, দক্ষিণ দিকে পাঠালেন হনুমান, নীল, জাম্ববান, গয়, গবাক্ষ প্রভৃতি বীরগণকে, পাশ্চিম দিকে পাঠালেন তারার পিতা অর্থাৎ তাঁর শ্বশুর সুষেণকে এবং উত্তর দিকে পাঠলেন শতবল নামক বীর বানরকে। তারা প্রত্যেকেই সসৈন্যে সীতা অন্বেষণে রওনা হলেন। তবে সব বানর সেনার মধ্যে হনুমান ছিলেন শ্রেষ্ঠ বীর। তাই সুগ্রীব হনুমানকেই সীতা উদ্ধারের গুরুভার অর্পণ করলেন। হনুমান রামের নিকট একটি অভিজ্ঞান (স্মৃতিচিহ্ন) চাইলে রাম তাঁকে একটি তাঁর নামাঙ্কিত অঙ্গুরীয় (আংটি) দেন যা দেখে সীতা বুঝতে পারে যে, হনুমান রাম কতৃর্ক প্রেরিত হয়েছেন। একমাস পর পূর্ব, উত্তর ও পশ্চিম দিকের বানররা সীতাকে না পেয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে এল। দক্ষিণ দিকে গমনকারী হনুমান, অঙ্গদ, জাম্বুবান প্রভৃতি বীরগণ সীতাকে খুজতে খুজতে বিন্ধ্য-পর্বতের নিকট গেলেন। তাঁরা বিন্ধ্য-পর্বতে বসবাসকারী জটায়ুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সম্পাতির নিকট জানতে পারে যে, এই দক্ষিণ সমুদ্রের ওপারে শতযোজন দূরে যে দীপ আছে সেখানে বিশ্বকর্মা নির্মিত লঙ্কাপুরীতে রাবণ বাস করে। সম্পাতির পুত্র সুপার্শ্ব রাবণকে দেখেছে এক নারীকে রথে করে লঙ্কার দিকে নিয়ে যেতে। সম্পাতির মুখের কথা শুনে বানরবীরগণ সমুদ্র পার হয়ে লঙ্কার যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। লম্ফ দ্বারা গয় দশ, গবাক্ষ বিশ, শরভ ত্রিশ, ঋষভ চল্লিশ, গন্ধমাদন পঞ্চাশ, মৈন্দ ষাট, দ্বিবিদ সত্তর, সুষেণ আশি এবং বৃদ্ধ মল্লরাজ জাম্বুবান নব্বই যোজন যেতে পারে। অঙ্গদ শত যোজন বিস্তৃত সমুদ্র পার হতে পারলেও ফিরে আসার শক্তি তাঁর নেই। একমাত্র হনুমানই ঐ সমুদ্র পার হয়ে আবার ফিরে আসতে পারেন। তাই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে লঙ্কায় গিয়ে সীতার অনুসন্ধানের জন্য একমাত্র হনুমানই উপযুক্ত। হনুমান মহেন্দ্র পর্বতে আরোহন করে সূর্য, ইন্দ্র, ভূতগণ ও পবনদেবকে বন্দনা করে বৃহদাকার দেহ ধারণ করে সমুদ্র পার হওয়ার জন্য লম্ফ দিলেন। হনুমান আকাশমার্গে সমুদ্র পারি দেওয়ার পথে সিংহিকা নামক এক রাক্ষসীকে বধ করেন। হনুমান সমুদ্রের ওপার গিয়ে লম্ব পর্বতে অবতরণ করে ত্রিকুট পর্বতের উপর অবস্থিত লঙ্কাপুরীকে দেখতে লাগলেন। সন্ধ্যাকালে হনুমান বিড়ালের রূপ ধারণ করে উত্তর দ্বার দিয়ে লঙ্কায় প্রবেশ করলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-১১। হনুমানের লঙ্কা-কাণ্ড।

    লঙ্কায় সীতাকে খুজতে খুজতে হনুমান অশোক বনে প্রবেশ করে একটি শিশু গাছে আরোহন করে দেখলেন যে, ঐ বৃক্ষের মূলে এক পরমা সুন্দরী রমণী রাক্ষুসী পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছেন। হনুমান ভাবলেন যে, হয়তো এই রমণীই দেবী সীতা হবেন। তারপর হনুমান দেখলেন যে রাবণ এসে সীতাকে পত্নী রূপে কামনা করল কিন্তু সীতা রাবণ ও তাঁর মাঝখানে একটি তৃণ রেখে রাবণকে দৃঢ় ভাষায় ভর্ৎসনা করলেন। রাবণ তখন ক্রোধান্বিত হয়ে চলে যাওয়ার আগে বলে গেলেন যে, দু মাসের মধ্যে সীতা যদি তার পত্নী হতে সম্মত না হন তবে সে সীতাকে হত্যা করবে। রাবণ চলে যাওয়ার পর হনুমান রামের গুণকীর্তন শুরু করলেন। সীতা শব্দ শুনে বৃক্ষের উপরে চেয়ে দেখেন একটি বানর রামের গুণকীর্তন করছেন। তারপর হনুমান সীতার পরিচয় জানতে চাইলে সীতা হনুমানকে তাঁর জীবনবৃত্তান্ত বললেন। সীতাও হনুমানের পরিচয় জানতে চাইলে হনুমান তাকে রামের বার্তাবাহক হিসেবে পরিচয় দান করেন। কিন্তু সীতার মনে হল এটা কোন মায়াবী রাক্ষসের ছলও হতে পারে। তখন হনুমান রামের দেওয়া অঙ্গুরীয় প্রদর্শন করলে সীতার বিশ্বাস হয় যে, হনুমান সত্যিই রামের দূত। হনুমান সীতাকে পিঠে করে লঙ্কা থেকে নিয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু তাতে রামের যশহানি হবে বলে তিনি হনুমানের সাথে যেতে চাইলেন না। সীতা চায় রাম যেন বীরত্বের সাথে লঙ্কায় এসে রাবণ বধ করে তাঁকে নিয়ে যান। হনুমান সীতার নিকট হতে অভিজ্ঞান স্বরূপ একটি বস্ত্রে শোভিত চূড়ামণি নিয়ে প্রস্থান করলেন।

    হনুমান লঙ্কা থেকে যাওয়ার পূর্বে শত্রুপক্ষের বলাবল যাচাই করতে চাইলেন। এজন্য তিনি অশোক বন লণ্ড-ভণ্ড করতে লাগলেন। রাক্ষসীদের নিকট রাবণ ঐ খবর জানাতে পেরে হনুমানকে বধ করার জন্য সৈন্য পাঠালেন। কিন্তু একে একে জম্বুমালী, মন্ত্রিপুত্রগণ, বিরূপাক্ষ, যূপাক্ষ, দুর্ধর্ষ, প্রঘস, ভাসকর্ণ, রাবণপুত্র অক্ষ প্রভৃতি রাক্ষসবীরগণ হনুমান কতৃর্ক নিহত হল। কোন উপায় না দেখে রাবণ তার পুত্র ইন্দ্রজিৎকে পাঠালেন। ইন্দ্রজিৎ বিভিন্ন বাণে হনুমানকে বিদ্ধ করতে চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হল। অবশেষে ইন্দ্রজিৎ ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে হনুমানকে বন্ধন করে রাবণের রাজসভায় নিয়ে গেলেন। রাবণ হনুমানের পরিচয় জিজ্ঞাসা করায় হনুমান জানালেন যে, তিনি রাম ও কিস্কিন্ধ্যারাজ সুগ্রীবের দূত। সীতাদেবীর খোজ তিনি লঙ্কায় এসেছেন। তিনি একথাও বলেন যে, রাম-লক্ষ্মণ ও সুগ্রীব সৈন্য-সামন্ত নিয়ে শীঘ্রই লঙ্কায় এসে সীতাদেবীকে উদ্ধার করবেন। হনুমানের কথা শুনে রাবণ হনুমানকে বধ করতে চাইল। কিন্তু রাবণ তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ধর্মনিষ্ঠ বিভীষণের উপদেশে সে হনুমানকে বধ করা থেকে বিরত হল। তবে তাকে শাস্তি দেয়ার জন্য তার লেজে অগুন ধরিয়ে দিলেন। সীতা একথা জানতে পেরে অগ্নির নিকট প্রার্থনা করলেন যেন হনুমানের লাঙ্গুল দগ্ধ না হয়। তারপর হনুমান দেখলেন যে, তাঁর লাঙ্গুলে আগুন থাকার পরও বরফের মত শীতল বোধ হচ্ছে। হনুমান তখন তাঁর ঐ লেজের আগুন দিয়ে সমস্ত লঙ্কাপুরী দগ্ধ করলেন। তারপর সমুদ্রের জলে আগুন নিভিয়ে এবং সীতাদেবীর নিকট বিদায় নিয়ে লঙ্কা পার হয়ে জাম্বুবান, অঙ্গদ প্রভৃতি সহচারীদের সাথে কিষ্কিন্ধ্যায় ফিরে এলেন। হনুমান সীতার দেওয়া মণি রামকে দেখলেন এবং সীতার সমস্ত বার্তা রামকে বললেন। সব কিছু শুণে রাম আবেগে আপ্লুত হলেন এবং প্রতীজ্ঞা করলেন যে সীতাকে উদ্ধার করে অযোধ্যায় নিয়ে যাবেন। তারপর রাম-লক্ষ্মণ, সুগ্রীব ও তার সৈন্য-সামন্তের সাথে উত্তরফাল্গুণী নক্ষত্রের দিনে যুদ্ধযাত্রা শুরু করলেন। তাঁরা সমুদ্র তীরবর্তী বেলাবনে এসে চিন্তা করতে লাগলেন কি করে সমুদ্র পার হওয়া যায়।

    হনুমানের লঙ্কা-দগ্ধ হওয়ার কথা এবং রামের লঙ্কা আক্রমনের কথা শুনে রাবণ একটু চিন্তিত হয়ে পড়লে অন্যান্য অসুররা তাকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিল। কিন্তু বিভীষণ রাবণকে উপদেশ দিলেন যে, রাম কোন সাধারণ মনুষ্য নয়। সকলের অবধ্য রাম লঙ্কা আক্রমন করলে লঙ্কার সব রাক্ষস ধ্বংস হবে তাছাড়া সীতাকে হরণ করে রাবণ অর্ধম করেছে তাই সীতাকে রামের নিকট ফিরিয়ে দেওয়াই তার কর্তব্য। বিভীষণের উপদেশ রাবণ অমান্য করল এবং অন্যান্য রাক্ষসরাও বিভীষণকে অনেক অপমান করল। তাই বিভীষণ লঙ্কা ছেড়ে রামের পক্ষে যোগ দিলেন। রাবণ শাদুর্ল নামক এক চরের নিকট খবর পেল যে, রাম-লক্ষ্মণ ও সুগ্রীবের বানরসেনারা লঙ্কা আক্রমন করতে আসছেন। তখন রাবণ শুক নামক মন্ত্রীকে পাঠালেন সুগ্রীবকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হওয়ার অনুরোধ করতে। শুক পক্ষী রূপ ধারণ করে সুগ্রীবের নিকট ঐ মন্ত্রণা দিলে সুগ্রীব তা প্রত্যাখ্যান করেন।

রামায়ণ কাহিনী: পর্ব-১২। সমুদ্র-সেতু রচনা ও লঙ্কা গমন। 

    রাম সমুদ্রের তীরে কুশ বিছিয়ে পূর্বমুখী হয়ে শয়ন করে সংকল্প করলেন, “হয় সাগর পার হব নয় সমুদ্র লুপ্ত করব”। কিন্তু ত্রিরাত্র আরাধনা করার পরেও সমুদ্র দেখা না দিলে, রাম সমুদ্র শুষ্ক করার জন্য ধনুতে ব্রহ্মাস্ত্র যোজনা করলেন। তখন সমুদ্র উপস্থিত হয়ে সমুদ্র পার হওয়ার উপায় বললেন। সমুদ্র জানালেন যে, বিশ্বকর্মাপুত্র নল তাঁর বক্ষে সেতু নির্মাণ করতে সমর্থ এবং তিনি আরো প্রতিশ্রম্নতি দিলেন যে, পার হওয়াকালে তিনি স্থির থাকবেন। কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্র অব্যর্থ, তাই রাম সমুদ্রের অনুরোধে উত্তরদিকে দ্রুমকুল্য নামক স্থানে ঐ তীর নিক্ষেপ করায় সেখানে গহববের সৃষ্টি হল এবং ঐ স্থান মরুকান্তার নামে খ্যাত হল। রামের নির্দেশে নল অন্যান্য বানরসেনাদের সহায়তায় শাল, কুটজ, অজুর্ন, তাল, আম্র প্রভৃতি বৃক্ষ ও পাহাড় পর্বতের দ্বারা পাঁচ দিনের মধ্যে শতযোজন সেতু নির্মাণ করলেন। সমুদ্র পার হয়ে সুগ্রীব সৈন্য-সামন্তসহ প্রচুর ফলমূল ও জল সমন্বিত স্থানে এসে আশ্রয় নিলেন। রামের নির্দেশে নীল ও অঙ্গদ বানরবাহিনীর মধ্যভাগ, ঋষভ ও গন্ধমাদন দক্ষিণ ও বামপার্শ্ব, রাজা সুগ্রীব পশ্চাদ ভাগ, জাম্ববান, সুষেণ, ও বেগদর্শী অভ্যন্তরভাগ এবং রাম-লক্ষ্মণ অগ্রভাগ রক্ষার দায়িত্ব নিলেন। রাবণের দূত শুক এরকম সৈন্য-বিভাগের কথা রাবণের নিকট গিয়ে সবিস্তারে বর্ণনা করল। তারপর রাবণের নির্দেশে শুক, সারণ, শাদুর্ল প্রভৃতি রাক্ষসরা রামের বানরসেনার নিকট এসে বানর রূপ ধরে সব খবরাখবর নিতে আসল। কিন্তু বিভীষণ তাদের চিনে ফেলে এবং তাদের ধরে রামের নিকটে নিয়ে যায়। দয়ালু রাম তাদের মুক্তি দিলে তারা রাবণের নিকট ফিরে আসে।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-১৩। লঙ্কা-যুদ্ধের প্রস্তুতি।

    রাবণের নির্দেশে বিদ্যুজ্জিুহ্ব নামক এক মায়াবী মায়াবলে রামের মুণ্ড ও বৃহৎ ধনুর্বাণ প্রস্তুত করে। তারপর রাবণ সীতার নিকট এসে বলে যে, বিদ্যুজ্জিহ্ব রামের মুণ্ড ছেদন করেছে। রাবণের নির্দেশে বিদ্যুৎজ্জিহ্ব রামের মুণ্ড ও ধনু সীতার নিকট রেখে যায়। সীতা তা দেখে বিলাপ করতে করতে ভূপাতিত হয়ে যায়। তারপর রাবণ চলে গেলে রাক্ষসী সরমা সীতাকে স্বান্তনা দিয়ে বলে যে, ঐ মুণ্ড রামের নয়, সবই রাবণের মায়া। সরমার কথা শুনে সীতা শান্ত হন। রাবণের মাতামহ মাল্যবাণ রাবণকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে এবং সীতাকে রামের নিকট ফিরিয়ে দিতে বলেন। কিন্তু রাবণ সে উপদেশ উপেক্ষা করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। রাবণ প্রহস্তকে পূর্বদ্বারে। মহাপার্শ্ব ও মহোদরকে দক্ষিণ দ্বারে, ইন্দ্রজীৎকে পশ্চিম দ্বারে নিযুক্ত করে সে নিজে উত্তরদ্বারের দায়িত্ব নিল। বিভীষণ অনল, পনস, সম্পাতি ও প্রমতি এ চার অমাত্যের সাহায্যে রাবণের যুদ্ধ পরিকল্পনা ও সৈন্য বিভাগের খবর পেয়ে রামকে জানালেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-১৩। লঙ্কা-যুদ্ধ শুরু।

    রাম-লক্ষ্মণ ও অন্যান্য বানরসেনারা সুবেল পর্বতে আশ্রয় নিয়ে লঙ্কা দেখতে লাগলেন। রাবণকে দেখতে পেয়ে সুগ্রীব হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে তার কাছে গিয়ে যুদ্ধ শুরু করল। কিছুক্ষণ যুদ্ধ করে রাবণের শক্তি যাচাই করে আবার সুবেল পর্বতে ফিরে আসল। সুবেল পর্বত থেকে নেমে রাম শুভকালে যুদ্ধ যাত্রার আদেশ দিলেন। রামের আজ্ঞায় বালীপুত্র অঙ্গদ আকাশপথে রাবণের নিকট গিয়ে কিছু রাক্ষস নিধন করে আবার রামের নিকট ফিরে আসলেন। বানর-সেনারা লঙ্কার প্রাচীর ভেঙ্গে লঙ্কা পুরীতে প্রবেশ করে রাক্ষসদের সাথে যুদ্ধ করতে লাগল। প্রথম দিনে রামের ছয় বাণে যজ্ঞশত্রু, মহাপার্শ্ব, মহোদর, বজ্রদংষ্ট্র, শুক ও সারণ এই ছয় রাক্ষসবীর মৃতপ্রায় হয়ে পলায়ন করল। অঙ্গদের হাতে রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎ পরাজিত হয়ে ক্রদ্ধ হল এবং মায়াবলে অদৃশ্য হয়ে আবার যুদ্ধ করতে লাগল। রাম-লক্ষ্মণ নিহত হয়েছে, এ সংবাদ সীতার নিকট পৌঁছালে সীতা শোকার্ত হন। তখন সীতার নির্দেশে ত্রিজটা পুষ্পক রথে করে তাঁকে রণক্ষেত্র দর্শন করান। সীতা দেখলেন যে, রণক্ষেত্রে অনেক বাণর-সেনার মৃত্যদেহ পড়ে আছে। রাম-লক্ষ্মণ অচৈতন্য হয়ে আছেন। সীতা বিলাপ করতে থাকলে ত্রিজটা তাঁকে এই বলে স্বান্তনা দেন যে, রাম-লক্ষ্মণ নিহত হননি এবং তাঁরা সকলে সুস্থ হয়ে শীঘ্রই যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসবেন। ত্রিজটার স্বান্তনাবাক্যে সীতা নিশ্চিন্ত হয়ে অশোক বনে ফিরে আসেন।

    বিভীষণের মাধ্যমে সুগ্রীব জানতে পারেন যে, রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎ ছল করে রাম-লক্ষ্মণকে নাগপাশে বদ্ধ করেছে। কিছুক্ষণ পর গরুড় উপস্থিত হলে রাম-লক্ষ্মণকে বন্ধনকারী নাগেরা ভয়ে পালিয়ে গেল এবং তাঁরা নাগপাশ মুক্ত হওয়ার পর রামকে আলিঙ্গন ও প্রদক্ষিণ করে গরুড় প্রস্থান করলেন। তারপর আবার যুদ্ধ আরম্ভ হল। যুদ্ধে হনুমানের হস্তে ধূম্রাক্ষ ও অকম্পন, অঙ্গদের হাতে বজ্রদংষ্ট্র এবং নীলের হাতে প্রহস্ত নিহত হল। প্রহস্তের মৃত্যুর পর রাবণ যুদ্ধ করতে এল। রাবণ সুগ্রীবকে পরাজিত করলে লক্ষ্মণ এলেন তার সাথে যুদ্ধ করতে। রাবণ লক্ষ্মণকে একটি শিবদত্ত শক্তি অস্ত্র নিক্ষেপ করলে লক্ষ্মণ অচেতন হয়ে পড়েন। রাবণ লক্ষ্মণের দেহ কাঁধে তুলে নিয়ে যেতে আসলে হনুমান তাকে মুষ্টিপ্রহার করে, ফলে সে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। এই সুযোগে হনুমান লক্ষ্মণকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেলেন। পরে সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে রাবণ আবার ঘোরতর যুদ্ধ শুরু করল। তাই রাম নিজেই তার সম্মুখে এসে যুদ্ধ শুরু করলেন। রাম রাবণের রথ, অশ্ব, সারথি, শূল ও খড়গ ছেদন করে রাবণের বক্ষে শরবিদ্ধ করায় সে মোহগ্রস্থ হল এবং তার হাত থেকে ধনু পড়ে গেল। তবে রাবণ রণক্লান্ত বলে রাম ঐদিন তাকে হত্যা না করে ছেড়ে দিলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-১৪। কুম্ভকর্ণ বধ।

    রাবণ রামের হাতে পরাজিত হয়েছে বলে লজ্জিত হল এবং সিংহাসনে বসে ব্রহ্মার বর ও পূর্বের বিভিন্ন কৃতকর্মের কথা চিন্তা করতে লাগল। ব্রহ্মা রাবণকে বর দিয়েছিলেন যে, কোন রাক্ষস ও দেবতা তাকে যুদ্ধে বধ করতে পারবে না কেবল মানবের হাতেই তার মৃত্যু হবে। রাবণ আরও স্মরণ করতে লাগল যে, পূর্বকালে ইক্ষ্বাকুবংশীয় অনরণ্য তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, ইক্ষ্বাকুবংশে এমন একজন মনুষ্য জন্মগ্রহণ করবে যার হাতে তাকে সবংশে নিধন হতে হবে। এছাড়া রাবণের কুকর্মের জন্য উমা, নন্দীশ্বর রম্ভা ও বরুণকন্যা পুঞ্জিকস্থলাও তাকে শাপ দিয়েছিল। এসব ভেবে রাবণ ভীত হয়ে পড়লেন এবং তার মনে হতে লাগল হয়তো রামের হাতেই তার মৃত্যু হবে। তাই রাবণ তার ভ্রাতা কুম্ভকর্ণকে নিদ্রা হতে জাগানোর সিদ্ধান্ত নিল। কুম্ভকর্ণ জন্মগ্রহণ করেই ক্ষুধার্ত হয়ে সহস্রর প্রজা খেয়ে ফেলেছিল। তখন ব্রহ্মা তাকে শাপ দিলেন এবং ঐ শাপে সে মৃতের মত শুয়ে থাকল। তখন রাবণ তার ভ্রাতার শাস্তি লঘু করার প্রার্থনা করলে ব্রহ্মা বললেন যে, কুম্ভকর্ণ ছয় মাস নিদ্রিত থেকে এক দিনের জন্য জাগবে এবং সেইদিন সে বহু লোক ভক্ষণ করবে। যা হোক, বিরাটাকার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভঙ্গের জন্য রাক্ষসরা উচ্চস্বরে চিৎকার, উচ্চরবে বাদ্য বাজানো, গদা ও মুষ্টি দ্বারা বক্ষে আঘাত, কর্ণকুহরে শতশত কলস জল ঢালা প্রভৃতি নানা কার্য করতে লাগল। তাতে ঘুম না ভাঙলে সহস্র হস্তী তার দেহের উপর উঠে চলাচল করলে কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙ্গে। কুম্ভকর্ণ রাবণের নির্দেশে যুদ্ধ করতে আসলে বানর-সেনারা তাকে দেখে ভয়ে পালাতে লাগল। কুম্ভকর্ণ বহু বানর ও ভল্লুককে ভক্ষণ করতে লাগল এবং সুগ্রীব, নীল, শরভ, গবাক্ষ, প্রলয়মেঘ, অঙ্গদ প্রভৃতি বীরদের পরাজিত করে রামের নিকট যুদ্ধ করতে এল। রাম বায়ব্য ও ঐন্দ্রাস্ত্রে কুম্ভকর্ণের দুই হস্ত এবং অর্ধচন্দ্র বাণে পদদ্বয় ছেদন করলেন। পরিশেষে ঐন্দ্র নামক শর দ্বারা রাম কুম্ভকর্ণের মস্তক ছেদন করলেন এবং তখন তার দেহ সমুদ্রে পতিত হল।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-১৫। মেঘনাথ বধ। 

    কুম্ভকর্ণের মৃত্যুতে রাবণ শোকে হতজ্ঞান হল। তারপর রাবণ দেবান্তক, নরনরান্তক, ত্রিশিরা ও অতিকায় নামক চার পুত্র এবং মহোদর ও মহাপার্শ্ব নামক ভ্রাতাকে যুদ্ধে পাঠাল। হনুমান দেবান্তক ও ত্রিশিরাকে, অঙ্গদ নরান্তককে, নীল মহোদরকে, ঋষব মহাপার্শ্বকে এবং লক্ষ্মণ ব্রহ্মাস্ত্রে অতিকায়কে বধ করলেন। রাবণের দুই ভ্রাতা ও চারপুত্র মৃত্যুর পর ইন্দ্রজিৎ মায়াবলে অদৃশ্য হয়ে মেঘের আড়ালে বসে যুদ্ধ শুরু করল। মেঘের আড়ালে থেকে যুদ্ধ করতে সমর্থ বলে ইন্দ্রজিতের আর এক নাম মেঘনাথ। ইন্দ্রজিৎ মন্ত্রসিদ্ধ প্রাস, শূল ও তীক্ষ্ণ বাণের দ্বারা হনুমান, সুগ্রীব, অঙ্গদ জাম্বুবান, সুষেণ প্রভৃতি বীরগণকে বিদ্ধ করে রাম-লক্ষ্মণের দিকে বাণ নিক্ষেপ করতে লাগল। ইন্দ্রজিৎ স্বয়ম্ভু প্রদত্ত ব্রহ্মাস্ত্র দ্বারা রাম-লক্ষ্মণকে বিবশ করে পিতা রাবণের নিকট গিয়ে বিজয়সংবাদ বিবৃত করল। রাম-লক্ষ্মণ ব্রহ্মাস্ত্রের দ্বারা বধ্য নয় কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্রের সম্মান রক্ষার্থে তাঁরা বিবশ হয়ে পড়ে থাকলেন। তখন রাম-লক্ষ্মণের নিরাময়ের জন্য জাম্বুবান হনুমানকে মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সাবর্ণ্যকরণী ও সন্ধানী এই চার প্রকার মহৌষধি আনার নির্দেশ দিলেন। হিমালয়ের কাঞ্চনময় ঋষভ ও কৈলাস পর্বতশিখরের মধ্যে দীপ্তিমান যে ঔষধি-পর্বত রয়েছে সেখানে ঐসব মহৌষধি রয়েছে। হনুমান ঔষধি-পর্বতে গেলে ঐ দীপ্তিমান ঔষধিসমূহ অদৃশ্য হওয়ায় হনুমান তা খুজে পেল না। তখন তিনি ক্রদ্ধ হয়ে ঐ ঔষধি-পর্বতকেই মাথায় উঠিয়ে নিয়ে আকাশপথে ফিরে এলেন। ঔষধির গন্ধ নিয়ে রাম-লক্ষ্মণ ও অন্যান্য বানর-সেনারা সুস্থ হয়ে ওঠল এবং হনুমান ঔষধি-পর্বত যথাস্থানে রেখে ফিরে আসলেন। বানরগণ পুণরায় যুদ্ধক্ষেত্রে এলে রাবণ কুম্ভ ও নিকুম্ভকে যুদ্ধে পাঠালেন। তাদের সাথে যূপাক্ষ, শোণিতাক্ষ, প্রজঙ্ঘ ও কম্পন যোগ দিল কিন্তু তারা সকলেই যুদ্ধে নিহত হল। পরে খরের পুত্র মক রাক্ষস যুদ্ধ করতে এলে রামের শরাঘাতে নিহত হয়। তারপর ইন্দ্রজিৎ এক মায়া দ্বারা সীতার মূর্তি নির্মাণ করে সেই মূর্তি রথে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে আসে। ইন্দ্রজিৎ হনুমানের সম্মুখে ঐ মায়াসীতার মুণ্ড ছেদন করে নিকুম্ভিলার যজ্ঞ-ভূমিতে হোম করতে চলে গেল। হনুমান শোকার্ত হয়ে রামের নিকট সীতাবধের সংবাদ দিলে রাম শোকে বিহ্বল হয়ে পড়লেন। তখন বিভীষণ এসে বুঝালেন যে, এসব ইন্দ্রজিতের মায়া কারণ রাবণ কখনও সীতাকে বধ করার নির্দেশ দেবে না।

    ইন্দ্রজিৎ নিকুম্ভিলায় যজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারলে তাকে বধ করা অসম্ভব হবে। তাই বিভীষণের উপদেশমত লক্ষ্মণ, হনুমান ও বিভীষণ বানর-সেনা নিয়ে নিকুম্ভলার যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলেন। যজ্ঞস্থল অসংখ্য রাক্ষস-সেনা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। লক্ষ্মণ ও হনুমান সেখানে গেলে ঐসব রাক্ষসসেনা তাঁদের আক্রমন করল। তারপর লক্ষ্মণ ও হনুমান রাক্ষস-সেনাদের বধ করতে শুরু করলেন। ইন্দ্রজিৎ তা টের পেয়ে অস্ত্রসহ যুদ্ধ করতে এল। লক্ষ্মণও হনুমানের পিঠে বসে যুদ্ধ শুরু করল। লক্ষ্মণ ও ইন্দ্রজিতের মধ্যে অনেকক্ষণ যাবৎ তুমুল যুদ্ধ হল। পরিশেষে ঐন্দ্রবাণে লক্ষ্মণ ইন্দ্রজিতের মস্তক দেহচ্যুত করলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-১৬। লক্ষ্মণকে শক্তি-শেল নিক্ষেপ।

    পুত্র ইন্দ্রজিতের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে রাবণ মুর্ছিত হল এবং পরে সংজ্ঞা লাভ করে ক্রোধিত হয়ে সীতাকে বধ করতে গেল। কিন্তু অমাত্য সুপার্শের পরামর্শে রাবণ সীতাকে বধ করা থেকে বিরত হল। পরের দিন অমাবশ্যা তিথিতে রাবণ সহস্রর হস্তী, রথ এবং অসংখ্য রাক্ষসবীর সমেত রামের সাথে যুদ্ধ করতে এল। তারপর রাম ও রাবণের সাথে তুমুল যুদ্ধ শুরু হল। কিছুক্ষণ পর লক্ষ্মণ রাবণকে আক্রমন করলেন। লক্ষ্মণ রাবণের ধ্বজ, ধনু এবং সারথির মস্তক ছেদন করলে রাবণ ক্রদ্ধ হয়ে লক্ষ্মণকে উদ্দেশ্য করে ময়দানব নির্মিত অষ্টঘণ্টাযুক্ত শক্তি-শেল নিক্ষেপ করল। ঐ শক্তি-শেল লক্ষ্মণের বক্ষভেদ করলে লক্ষ্মণ ভূতলে পড়ে গেলেন। রামের নির্দেশে সুগ্রীব ও হনুমান লক্ষ্মণকে যুদ্ধস্থল থেকে নিয়ে গেলেন। তারপর রাম ক্রোধ ও পরাক্রমের সাথে রাবণের প্রতি শরবষর্ণ করতে লাগলেন। তখন রাবণ নিপীড়িত হয়ে রণস্থল ত্যাগ করল। রাম লক্ষ্মণের শোকে বিহ্বল হয়ে বললেন, “দেশে দেশে পত্নী পাওয়া যায়, দেশে দেশে বন্ধুও মেলে কিন্তু এমন দেশ দেখি না, যেখানে লক্ষ্মণের মত সহোদর ভ্রাতা পাওয়া যায়”। তখন সুষেণ রামকে স্বান্তনা দিয়ে শান্ত করলেন এবং হনুমানকে বলল জাম্বুবান পূর্বে যে ঔষধি-পর্বতের কথা বলেছিল তার দক্ষিণ শিখর থেকে বিশল্যাকরণী, সাবর্ণ্যকরণী, সঞ্জীবকরণী ও সন্ধানী এই চার প্রকার মহৌষধি শ্রীঘ্র নিয়ে আসতে। হনুমান দ্রুত সেখানে গিয়ে পর্বতের শৃঙ্গ সমেত মহৌষধি নিয়ে এলেন। সুষেণ ওষধি পেষণ করে লক্ষ্মণকে আঘ্রাণ করালে লক্ষ্মণ সুস্থ হয়ে উঠলেন এবং রাম আনন্দে আত্মহারা হলেন। তখন ইন্দ্র রামের জন্য একটি রথ, ঐন্দ্র মহাধনু, শর, কবচ ও শক্তি পাঠালেন। রাম সে রথে আরাহন করে রাবণের সাথে যুদ্ধ করতে গেলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-১৭। রাম-রাবণের যুদ্ধ এবং রাবণ বধ।

    আবার শুরু হল রাম-রাবণের ঘোরতর যুদ্ধ। রাম রাবণের গান্ধর্ব ও দৈবাস্ত্র অনুরূপ অস্ত্র দ্বারা এবং সর্পাস্ত্র গরুড় অস্ত্র দ্বারা ছিন্ন করলেন। দেবতা ও অসুররাও রাম-রাবণের যুদ্ধ দেখতে এলেন। আগস্ত ঋষি যুদ্ধ দেখতে এসে রামকে একটি স্তোত্র পাঠ করতে বললেন যা রাবণবধ তরান্বিত করবে। রাম সূর্যের উদ্দেশ্যে ঐ স্ত্রোত্র পাঠ করে রাবণের সাথে তুমুল যুদ্ধ করতে লাগলেন। রাম তীক্ষ্ণ শরাঘাতে রাবণের মস্তক ছেদন করলেও অনুরূপ আর একটি মস্তক উৎপন্ন হল। যতবার মস্তক ছেদন করা হয় ততবার নতুন মস্তক উৎপন্ন হতে থাকে। তারপর রাম সারথি মাতলির পরামর্শে রাবণের প্রতি ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করলে তা রাবণের বক্ষ ভেদ করে এবং রাবণ ভূতলে পতিত হয়। রাবণবধের পর দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-১৮। সীতার অগ্নি-পরীক্ষা।

   রাবণের মৃত্যুতে বিভীষণ শোকার্ত হলেন। রাবণের জ্যেষ্ঠা পত্নী ময়কন্যা মন্দোদরী সহ অন্যান্য পত্নীগণও বিলাপ করতে লাগল। তখন রাম তাদের স্বান্তনা দিলেন। রামের নির্দেশে বিভীষণ রাবণের অগ্নি-সৎকার করলেন। তারপর রাম-রক্ষ্মণকে বিভীষণকে লঙ্কার রাজা পদে অভিষিক্ত করলেন। হনুমান সীতার নিকট গিয়ে রাবণবধের সংবাদ দিলেন সীতা আনন্দে বিহ্বলা হলেন এবং রামকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। হনুমান রামকে গিয়ে সীতার কথা বললেন। তখন রাম বিভীষণকে নির্দেশ দিলেন সীতাকে স্নান করিয়ে তাঁর নিকট নিয়ে আসতে। বিভীষণ সীতার নিকট গিয়ে রামের সংবাদ শোনালে সীতা স্নান করে বস্ত্রালঙ্কারে ভূষিতা হয়ে রামের নিকট এলেন। রাম ও সীতা পরস্পরকে দর্শন করতে লাগলেন। কিন্তু রাম সীতার চরিত্রে সন্দেহ প্রকাশ করে সীতাকে প্রত্যাখ্যান করলেন। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। তখন সীতা লজ্জায় ও শোকে অগ্নিতে প্রবেশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। “রাম যাকে দুষ্টা মনে করেন সে আমি যদি শুদ্ধচরিত্রা হই, তবে লোকসাক্ষী অগ্নিদেব, আমাকে রক্ষা করুন” এই বলে সীতা অগ্নিতে প্রবেশ করলেন। সমবেত রাক্ষস, বানর ও স্ত্রীগণ উচ্চস্বরে রোদন করতে লাগল। তখন কুবের, যম, পিতৃগণ, ইন্দ্র, বরুণ, মহাদেব ও ব্রহ্মা উপস্থিত হলেন। ব্রহ্মা রামকে বললেন যে, সীতা সতী এবং রাম স্বয়ং শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী নারায়ণ। তারপর অগ্নি সীতাকে ক্রোড়ে নিয়ে চিতা থেকে উঠলেন এবং রামের হাতে সীতাকে সমর্পণ করে বললেন, “এই নিষ্পাপ বিশুদ্ধ-স্বভাবা মৈথেলীকে অসংকোচে গ্রহণ কর”। তারপর রাম ক্ষণকাল চিন্তা করে বললেন, “সীতা রাবণগৃহে দীর্ঘকাল ছিলেন, সেজন্য তাঁর শুদ্ধি আবশ্যক নতুবা লোকে বলবে দর্শরথপুত্র রাম মুর্খ ও কামুক। আমি জেনেছি, সীতা অনন্যহৃদয়া, ইনি নিজের তেজেই রক্ষিতা, রাবণ তাঁকে মনে-মনেও ধর্ষণ করতে পারেনি। নিজের কীর্তির ন্যায় সীতাকে আমি ত্যাগ করতে পারি না। আপনারা সকলে যে হিতবাক্য বললেন তা অবশ্যই আমি পালন করব”।

    সীতার অগ্নিপরীক্ষার একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। সীতা যে সতী ও পতিব্রতা, তা রাম মর্মে-মর্মে উপলব্ধি করেন। কিন্তু লোকসম্মুখে তিনি প্রমাণ করতে চাইলেন যে, তাঁর পত্নী কতটা সতী। অগ্নিপরীক্ষার পূর্বেই রাম জানতেন যে, অগ্নিতে সীতা দগ্ধ হবেন না কিন্তু সবার কাছে সীতার মাহাত্ম্য ও সতীত্বকে প্রকাশ করতেই এই নাটক করলেন। রাম দেবী সীতাকে কলঙ্ক দেওয়ার ছলে আরও মহিমান্বিত করলেন। তারপর স্বর্গ থেকে দশরথ এসে রাম-সীতাকে দর্শন দিলেন। বনবাসের চতুর্দশ বর্ষ উত্তীর্ণ হওয়ায় দশরথ রামকে অযোধ্যায় গিয়ে অভিষিক্ত হতে বললেন। লক্ষ্মণকে রাম-সীতার সেবা করার নির্দেশ দিলেন। সীতাকে দশরথ বললেন, “পুত্রী, তুমি রামের উপর রুষ্ট হয়ো না, তোমার হিত কামনায় এবং শুদ্ধির নিমিত্তই রাম তোমাকে ত্যাগের কথা বলেছিলেন। তুমি যে অসামান্য চরিত্র-লক্ষণ দেখিয়েছ, তাতে অন্য সকল নারীর যশ পরাভূত হবে”। দশরথ সকলকে আশীর্বাদ করে স্বর্গে প্রস্থান করলেন। ইন্দ্র রামের ইচ্ছায় মৃত সব বানরদের জীবিত করে বিদায় নিলেন। তারপর বিভীষণ, সুগ্রীব, হনুমান এবং তাঁদের সহচরদের (বানর ও রাক্ষস) সাথে পুষ্পক রথে করে রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা অয্যেধ্যায় ফিরে আসলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-১৯। রাম-সীতার অযোদ্ধায় প্রত্যবর্তন

    প্রথমে তাঁরা ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে এলেন এবং হনুমান গিয়ে ভরতকে সব সমাচার জানালেন। রাম বনে যাওয়ার পর ভরত অযোধ্যা থেকে এক ক্রোশ দূরে নন্দীগ্রামে জটা ধারণ করে রামের পাদুকাদ্বয় সম্মুখে রেখে রাজ্য পরিচালনা করতেন। হনুমানের সংবাদ শুনে ভরত আহ্লাদিত হয়ে শত্রুঘ্নকে রামের সংবর্ধনার আয়োজন করতে বললেন। তারপর সেই বহুপ্রতীক্ষিত শুভক্ষণ। রাম-সীতা-লক্ষ্মণের সাথে ভরত-শত্রুঘ্ন ও তাঁদের মাতাদের মিলন ঘটল। তারপর রাম-সীতাকে বস্ত্র ও স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত করে পাচঁশত নদীর জলে অভিষিক্ত করা হল। রামের রাজা পদে অভিষেকের পর সুগ্রীব ও বিভীষণ তাঁদের অনুচরদের নিয়ে নিজ নিজ দেশে গিয়ে বাস করতে লাগলেন। ভরতকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করা হল। রাম রাজা হয়ে দশ বার অশ্বমেদ যজ্ঞ সহ বিবিধ যজ্ঞ করতে লাগলেন। রামের রাজত্বে প্রজারা অতি সুখে জীবন অতিবাহিত করতে লাগলেন। ঋষি বাল্মীকি এ পর্যন্তই রামায়ণ রচনা করেছিলেন।

রামায়ণ কাহিনী : পর্ব-২০। উত্তর কাণ্ড।

    উত্তর কাণ্ড বাল্মীকি প্রণীত নয় এবং এটা রামায়ণের পরে রচিত হয়েছে। উত্তর কাণ্ডের কাহিনী এরকম রাম রাজা পদে অভিষিক্ত হওয়ার পর প্রজাদের পরম স্নেহে লালন-পালন করতে লাগলেন। কিন্তু কিছুদিন পর যখন সীতা দেবীর গর্ভ-লক্ষণ দেখা গেল তখন সীতার সতীত্ব নিয়ে প্রজাদের অনেকেই সংশয় প্রকাশ করল। সীতা সতী ও নিষ্পাপ জেনেও রাম লোকনিন্দার ভয়ে প্রজাদের মনরক্ষার জন্য তাঁকে ত্যাগ করলেন। তাই লক্ষ্মণ সীতাকে রামের নির্দেশে গঙ্গার অপর পারে তমসা নদীর তীরে বাল্মীকি মুনির আশ্রমে রেখে আসলেন। সেখানে সীতা লব ও কুশ নামের দুই জমজ পুত্র প্রসব করেন। তারপর রাম অশ্বমেদ যজ্ঞ করলে সে যজ্ঞে আমন্ত্রিত হয়ে বাল্মীকি তাঁর শিষ্যগণ ও লব-কুশকে সাথে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। বাল্মীকির নির্দেশে লব-কুশ বীণাযন্ত্র সহযোগে যজ্ঞে উপস্থিত সকলকে রামায়ণ গান শোনালেন। ঐ রামায়ন গান শোনার পর রাম লব-কুশের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা নিজেদের বাল্মীকির শিষ্য বলে পরিচয় দেন। কিন্তু রাম বুঝতে পারেন যে, এ বালকদ্বয় তাঁরই পুত্র। তখন রাম বাল্মীকির অনুমতি নিয়ে সীতাকে যজ্ঞস্থলে নিয়ে আসার জন্য দূত পাঠালেন। রাম চাইলেন সকলের সামনে সীতা আত্মশুদ্ধির জন্য শপথ করুক এবং মনে মনে স্থির করলেন আত্মশুদ্ধির পর তিনি সীতাকে পুনরায় পত্নী রূপে গ্রহণ করবেন। কিন্তু পরের দিন সীতাদেবী যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়ে সকলের সামনে বললেন, “আমি যদি রাঘব ভিন্ন অন্য কাউকে মনে-মনেও চিন্তা করে থাকি, তবে মাধবী দেবী (পৃথিবী) বিদীর্ণ হয়ে আমাকে আশ্রয় দিন”। তখন মাধবী দেবী উপস্থিত হয়ে সীতাকে সিংহাসনে বসিয়ে রসাতলে নিয়ে গেলেন। সীতার এমন সতীত্ব দেখে উপস্থিত সবাই ধন্য-ধন্য করতে লাগলেন।

    রাম সীতার শোকে কাতর হয়ে বিলাপ করতে লাগলেন এবং ধরিত্রীদেবীর নিকট হতে সীতাকে উদ্ধার করে আনার শপথ করলেন। তখন ব্রহ্মা দেবগণের সাথে এসে রামকে বললেন যে, রাম স্বয়ং বিষ্ণু এবং সীতা লক্ষ্মী। সময় হলে স্বর্গে দুজনার আবার মিলন হবে। ব্রহ্মার কথা শুনে রাম শান্ত হলেন এবং ব্রহ্মার নির্দেশে রাম বাল্মীকির নিকট রামায়ণের উত্তর কাণ্ড শুনতে চাইলেন। তখন বাল্মীকি উত্তর কাণ্ড রচনা করেন এবং লবকুশ তা রামকে শোনান। তারপর রাম পুনরায় বিবাহ না করে সীতার মূর্তি পাশে রেখে দশ বৎসর যাবৎ অশ্বমেদ, বাজপেয়, অগ্নিষ্টোম প্রভৃতি যজ্ঞ সম্পন্ন করলেন। তারপর ব্রহ্মার নির্দেশে কাল এসে রামকে জানালেন যে, তাঁর ভবলীলা সাঙ্গ করার সময় এসে গেছে। তখন রাম উত্তর কাণ্ডের কাহিনী অনুসারে লক্ষ্মণকে বর্জন করলেন। লক্ষ্মণ তখন সরযূ নদীর তীরে যোগবলে দেহত্যাগ করলেন। রাম লক্ষ্মণের শোকে কুশকে দক্ষিণ কোশল এবং লবকে উত্তর কোশল রাজ্যের ভার অর্পণ করে সরয়ূ তীরে গেলেন। ভরত ও শত্রুঘ্নও রামের সাথে সরযূ তীরে গেলেন। রাম তাঁর অনুজগণের সঙ্গে সশরীরে বৈষ্ণবতেজে প্রবিষ্ট হলেন। এভাবে রামায়ণের সমাপ্ত হল।

(আমা কর্তৃক লিখিত “হিন্দুধর্মের সারকথা” পুস্তক থেকে সঙ্কলিত)

এই ওয়েবসােইটের সকল ধর্মীয় পোস্ট  পড়ার জন্য এই <পোস্ট দেখুন> অংশে ক্লিক করুন

আরও পড়ুন

ঈশ্বরতত্ত্ব










 হিন্দু দেবতা